একটি নৌপথ ও সাড়ে চার লাখ মানুষের আর্তনাদ

জিসান মাহমুদ

৫০৭

প্রকাশিত: ১২:১১, ১৬ জুলাই ২০২০  

শেয়ার করুন:-
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বলছিলাম চট্টগ্রামের সাগরবেষ্টিত দ্বীপ সন্দ্বীপের যাতায়াত ব্যবস্থার কথা। হাজার বছরের ঐতিহ্য ঘেরা মেঘনা মোহনায় অবস্থিত প্রাচীন দ্বীপ সন্দ্বীপ। প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস এখানে। রয়েছে হাজারো ইতিহাস। 

একটা সময় বিখ্যাত ছিল জাহাজ ও লবন শিল্পের জন্য। সবচেয়ে সুন্দর ও মজবুত জাহাজ নির্মাণ হতো এখানে, এবং সেগুলো উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি হতো। 

দ্বীপে জন্ম নিয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুনী, কবি-সাহিত্যিকরা। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন সব দ্বীপকে হার মানাবে। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ যোগান দিচ্ছেন এই দ্বীপের মানুষ। এতকিছুর পরও এই দ্বীপের মানুষ একটা জায়গায় অবহেলিত, আর সেটা হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থা।

সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুত আনা সহ বিগত কয়েক বছরে সন্দ্বীপের ব্যাপক উন্নয়ন দেখা গেলেও মূল ভূখন্ডে যাওয়ার একমাত্র নৌপথ যেন প্রাচীনযুগের মত রয়ে গেছে। এ  নৌপথের এখনো কোনো সুফল মিলেনি। 

সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার ৭টি ফেরিঘাট থাকলেও সচল রয়েছে কুমিরা-গুপ্তছড়া ফেরিঘাট। ২০১২ সালে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুপাশে দুটি জেটি নির্মাণ করলেও গুপ্তছড়া অংশে কোনো কাজে আসছে না এটি। যা নির্মাণ ত্রুটির কারণে ৬ মাসের মধ্যে ভেঙে পড়ে যায়। সাড়ে চার হাজার ফুট দীর্ঘ জেটিটি অবশিষ্ট আছে মাত্র দুই হাজার ফুট। অথচ এই জেটি ব্যবহার বাবদ প্রতিবছর বিআইডব্লিওটিএকে ৪০ লাখ টাকা টোল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষেকে। কুমিরা অংশে থাকা জেটিও ব্যবহার হচ্ছে কেবল জোয়ারের সময়। যার ফলে দূর্ভোগের যেন শেষ থাকেনা সন্দ্বীপের মানুষের। কোমর পরিমাণ পানিতে নেমে যেতে হয় যাত্রীদের। এরপর কাঁদা মাড়িয়ে পাড়ে উঠতে হয়। আবার নৌযানে উঠার সময়ও একই অবস্থা। শুধু তাই নয় স্টিমার কিংবা লঞ্চে উঠতে নামতে হলে অবৈধ লালবোট ব্যবহার করতে হয়। যার কারণে ২০১৭ সালে ২ এপ্রিল হারাতে হয়েছে ১৮ টি তাজা প্রাণ। এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে হয় দ্বীপের মানুষদের।

এই রুটে প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। অথচ, যাতায়াতের জন্য এখানে কোনো স্থায়ী নৌযান নেই। ফলে উত্তাল সমুদ্রে কখনো অবৈধ স্পিডবোট, কখন লঞ্চ, আবার কখনো স্টিমারে যাতায়াত করতে হয়। এই নৌপথে যেন অনিয়মের শেষ নেই। 

এখানে লাইফ জ্যাকেট থাকা সত্ত্বেও সবসময় যাত্রীদের দেয়া হয় না, রাত্রিবেলা নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, যার কারণে দিনের বেলা নৌযান সচল থাকলেও রাত্রিবেলা অচল হয়ে পড়ে। স্টিমার কিংবা অন্য কোনো নৌযানে উঠার জন্য চলছে অবৈধ লাল বোট, সেই লাল বোটে চলে বকশিসের নামে চাঁদাবাজি। দুই পাড়ে ১০ টাকা করে ২০ টাকা দিতে হয় তাদের। বকশিশ আদায়কে কেন্দ্র করে প্রায়ই যাত্রী ও বোট কর্মচারীদের মধ্যে হাতাহাতি বা মারামারির ঘটনা ঘটে। যারা বকশিশ দিতে চায় না তাদের নানাভাবে নাজেহাল করে থাকে বোটের কর্মচারীরা। 

নেই মানসম্মত টয়লেট, পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনীর অভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে হয় যাত্রীদের। যাত্রীর মালামাল নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম না থাকায় অতিরিক্ত টিকেট খরচ দিয়ে মালামাল আনা-নেওয়া করতে হয়। এছাড়াও নারী পুরুষের আলাদা টিকেট কাউন্টার নেই বলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। পুরাতন নৌযান হওয়ায় মাঝপথে আবার বিভিন্ন সময় ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। 

শীতকালে যাত্রী পারাপার নিরপদ হলেও বর্ষাকালে কঠিন অবস্থা দাঁড়ায়। এছাড়া স্পিড বোটে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, ঝুঁকি নিয়ে মালবাহী বোটে যাত্রী আনা নেওয়াসহ নানান অভিযোগ তো আছেই। ফলে একপ্রকার জিম্মি হয়ে ওই পথে আসা যাওয়া করতে হচ্ছে হাজার হাজার যাত্রীকে। এসব কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। এর আগেও একাধিকবার নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এ দ্বীপের অসংখ্য মানুষ। প্রতিবার দুর্ঘটনা শেষে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু দোষীদের বিচার হয় না।

এবার আসি সি-এম্বুলেন্স নিয়ে, ২০০৮ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২৫ লাখ টাকায় একটি সি-এম্বুলেন্স দিলেও চালক ও জ্বালানির অভাবে ৩ বছর পড়ে থাকে এটি। বহুদিন অচল থাকার পর ২০১১ সালে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে অস্থায়ীভাবে একজন চালক ও জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় এক বছর চলার পর বন্ধ হয়ে যায় এটি। এরপর আর চালু হয়নি। ২০১৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এর পক্ষ থেকে ৬৫ লাখ টাকায় আরেকটি সি-এম্বুলেন্স দেওয়া হয়। আগেরটির মতো এটারও চালক ও জ্বালানি তেলের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে রোগীদের জন্য সি-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও একদিনের জন্যও সেটি ব্যবহার করা যায়নি। বর্তমানে এটি সড়কের পাশে খালে ফেলে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র প্রদর্শনীর জন্য। 

সন্দ্বীপে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় এই উত্তাল সমুদ্রে এভাবে রোগীদের চট্টগ্রাম আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কুলিদের টাকা দিলে তারা বৃদ্ধ বা অসুস্থ লোকজনকে কাঁধে করে পৌঁছে দেয়। অনেক সময় ভোগান্তির কারণে যাত্রাপথে রোগী মারা যায়। সি-এম্বুলেন্স'র অভাবে বিভিন্ন সময় এই উত্তাল সমুদ্রে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত্রিবেলা লাল বোটে করে নেওয়া হয় রোগীদের। কৃত্তিম অক্সিজেন দেওয়া রোগীকে জরুরী অবস্থায় এভাবে লাল বোটে করে নেওয়া সত্যি মর্মান্তিক। যে লাল বোট অন্যান্য জায়গায় জেলেদের মাছ ধরার জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে, সেটি সন্দ্বীপে জরুরী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়।

অন্যদিকে, ২০১২ সালে গুপ্তছড়া ঘাটে নির্মিত জেটিটি বিকল হয়ে যাওয়ায় তার পাশে বর্তমানে ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন আরেকটি জেটির কাজ চলছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। কিন্তু অতিরিক্ত চর জাগার কারণে এ জেটিও সাধারণ মানুষের তেমন কাজে আসবে না। নতুন জেটির দৈর্ঘ্য প্রথমে ছিল দশমিক ৬ কিমি। প্রকল্প ছিল ৪৬ কোটি ৯২ লাখ টাকার। পরে তা দশমিক ১ কিমি বাড়িয়ে প্রকল্প আনে ৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়। আরো দশমিক ৫ কিমি বাড়াতে চাই বিআইডব্লিওটিএ। কিন্তু তার পরও সুফল মিলবে বলে মনে হয় না দ্বীপবাসীর। এর জন্য আগের জেটির মতো সাধারণ মানুষকে আবার টোল গুনতে হবে। উঠানামার কষ্ট লাগবে এখন বিকল্প হিসেবে কাজ করছে কেওড়া কাঠের নির্মিত সেতু। দ্বীপের মানুষের শেষ ভরসা এই কাঠের সেতু। জোয়ার থাকলে কাঠের সেতুতে চলাচল করা যায়, তাও শিশু বৃদ্ধাদের জন্য সেটা কষ্টকর। কিন্তু বাটা থাকলে  দেড় থেকে দুই'শ গজ পথ কাঁদা মাড়িয়ে পাড়ে আসতে হয়।

সারাদেশে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে, তখন ব্যতিক্রম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও নৌপথ এখনো নিরাপদ হয়নি। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়া ওঠা এই জনপদ যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেন ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার আগে ছিলো হেলিকপ্টার সার্ভিস। পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আসে বিআইডব্লিউটিসির বড় বড় জাহাজ। কিন্তু সময়ের সাথে সেগুলোও এখন বন্ধ। চর সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি জেটিগুলোও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে দ্বীপের সাড়ে চার লাখ মানুষ। ভোগান্তি যেন তাদের পিছু ছাড়ছেই না। সন্দ্বীপের মাননীয় সাংসদ বারবার সংসদে এই বিষয় উপস্থাপন করলেও এখনো কোনো সুরহা মিলেনি। যদি এই নৌপথ নিরাপদ করা যায় তাহলে সন্দ্বীপ হবে অন্যতম এক পর্যটন নগরী। গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা। তাই সরকারের উচিৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দ্বীপবাসীর কষ্ট লাগবে নৌ যাতায়াত নিরাপদ করা।

[email protected]

শেয়ার করুন:-
সারাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত