জুলাই ৩: দিনটি কীভাবে ভুলবেন ড. সালেহা কাদের!

মোশাররফ হোসেন

৭২১

প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ৩ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৬:১৯, ৩ জুলাই ২০২০

শেয়ার করুন:-
মোজাক্কির হোসেন খান মিশু এখন উর্দ্ধলোকে, না-ফেরার দেশে।

মোজাক্কির হোসেন খান মিশু এখন উর্দ্ধলোকে, না-ফেরার দেশে।

সময় থেমে থাকেনি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়েছে নিজের মতো করে। সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, মাস ঘুরে বছরও চলে গেছে। শুধু ড. সালেহা কাদেরের জীবনের ঘড়িটা থেমে গেছে। সন্তানহারা এই মায়ের বুকের ভেতর এখনো অবিরাম রক্তক্ষরণ। 

এই প্রতিভার আকালের দেশে অল্প কজন প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী মানুষের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। কিন্তু হায়! অকালেই ঝরে গেলেন। মোজাক্কির হোসেন খান মিশু এখন উর্দ্ধলোকে, না-ফেরার দেশে।

( ক্লিক করে পেজটিতে লাইক দিন। ভালোর সঙ্গে থাকুন। অন্যকেও ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করুন।)

মোজাক্কির শুধু যে নিজে স্বপ্ন দেখতেন তা-ই নয়, অন্যদেরও স্বপ্ন দেখাতেন। আর সেই স্বপ্ন সফল করার সংগ্রামে নেমেছিলেন তিনি। একজন তরতাজা স্বপ্ন দেখা সৃজনশীল তেজোদীপ্ত মানুষ এভাবে চলে গেলেন! তার এই অকাল মৃত্যু অবিশ্বাস্য! কিন্তু নিয়তির বিধান এভাবেই বোধ হয় লিখে রাখেন বিধাতা। প্রভু তাকে অকালে নিয়ে গেলেও সম্মান দানে  কার্পণ্য করেননি। এ মৃত্যু সম্মান ও গৌরবের।  

২০১৭ সালের ৩ জুলাই পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩১ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন।  তার মৃত্যুতে তিন বাহিনীর সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।  

লে. কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান মিশু । সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান, শিক্ষানুরাগী, মিরপুরে প্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, চেরিব্লুসম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মহীয়সী  ড. সালেহা কাদেরের একমাত্র পুত্র।  

মেধাবী মোজাক্কির

স্কুলে পড়াকালীন মোজাক্কির এর রয়েছে অনেকগুলো অর্জন।  তন্মধ্যে ক্লাশ থ্রীতে পড়াবস্থায় মোজাক্কির কম্পিউটার আয়ত্ত করে নেন। সরকারি বৃত্তি পেয়ে জাপানে ছয় মাস একটি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পান। এছাড়া স্কুলে পড়ার সময় মোজাক্কির প্রেসিডেন্ট এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। সম্পূর্ণ সরকারি স্কলারশীপে অনেকবার ভারত, মালয়েশিয়াসহ বহুদেশ সফরের সুযোগ পান। সেভেনে পড়ার সময় স্কাউটিং এ বাংলাদেশ থেকে দুটি ছেলে জাপানে যাবার সুযোগ পায়। তাদের মধ্যে একজন মোজাক্কির। তার আগে ‘কাব’ CUB ( a junior branch of the Scout Association, for boys aged about 8 to 11) - এ থাকাকালীন তিনি ভারত সফর করেন। তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ক্যাডেট প্রশিক্ষণকালীন অসামান্য কৃতিত্তের স্বীকৃতিস্বরুপ মোজাক্কির সম্মানসূচক  Sword of Honour   (শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণনার্থীর স্বীকৃতি) লাভ এবং ব্যাচে প্রথম স্থান লাভ করেন ।   

সোনিয়া গান্ধি, নেশা দেশাইসহ পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে মোজাক্কির ফটোসেশনে অংশ নিয়েছেন।  অনেকগুলো দেশ থেকে পুরষ্কার অর্জন করে তিনি দেশের মুখ উজ্জল করেছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন তার ক্যারিশমাটিক ব্যক্তিত্ব দিয়ে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাকে নিয়ে বেশকিছু আর্টিকেলও ছাপা হয়। 

ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত পরিপাটি স্বভাবের মোজাক্কির হোসেন মিশুর ইচ্ছা ছিল ডিফেন্সে চাকরি। মা ড. সালেহা কাদের তার মতের সঙ্গে একমত না হলেও  কখনো তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। সব সময় সমর্থন জুগিয়েছেন। ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন মোজাক্কির জানতে পারেন নেভিতে কমিশনে রিক্রুট হচ্ছে। কালক্ষেপণ না করে ইন্টারভিউতে অংশগ্রহন করেন। নেভিতে পাল তুললেন তিনি। কর্মদক্ষতার গুণে মোজাক্কির তড়িৎ বেশ কয়েকটি প্রমোশন লাভ করেন।      

 

বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর এভিয়েশনকে  মোজাক্কির হোসেন তিলে তিলে গড়েছেন। প্রথম নৌ বাহিনী হেলিকপ্টার কুচকাওয়াজে তিনি নেতৃত্ব দেন যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৬  সালের একটি প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিেিত লে. কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান মিশু BNS Bangabandhu   তে হেলিকপ্টার ডেক লেন্ডিং প্রদর্শণ করেন। এটি ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং, তার সাফল্যে বাংলাদেশ নেভি প্রধান তাকে নিজ হাতে লিখিত পত্রে প্রশংসা করেন এবং তাকে উদ্দেশ্যে করে বিভিন্ন সম্মানসূচক কমেন্ট করেন। যার দ্বারা মোজাক্কির তার জুনিয়রদের কাছে হিরো বনে গেলেন। দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন তাদের কাছে। এছাড়া তিনি ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বিজয় দিবস উড্ডয়ন মহড়ায়ও অংশগ্রহন করে তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। 

মোজাক্কির এর যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে সরকার তাকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়।  প্রত্যেক প্রশিক্ষণে তিনি সফলতা লাভ করেন। 

তিনি ছিলেন পাইলট ইনস্ট্রাক্টর। অর্থাৎ পাইলট তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এছাড়া হেলিকপ্টার কীভাবে চালাতে হয় অন্যদের সেই ট্রেনিংও দিতে হতো।  প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকা, ইটালি, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারের তত্বাবধানে তিনি সেসব দেশ ভ্রমণ করেন। অসামান্য ব্যক্তিত্বের কারণে স্বল্প সময়ে মোজাক্কির সবার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। স্বল্প সময়ে এতো জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য  তিনবাহিনীর প্রধানরা তাকে খুবই পছন্দ করতেন।

 

মোজাক্কিরের বিষয়ে আরো জানতে সেদিন ছুটে গিয়েছিলাম মা ড. সালেহা কাদেরের কাছে।  

গোটা সময় সালেহা কাদের কথা বলেছেন কান্না চেপে রেখে। প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ভেতরে  আমার কী যে যন্ত্রণা! আমি আল্লাহর কাছে শুধু একটা কথাই বলি- এ তুমি আমাকে কী পরীক্ষার মধ্যে ফেললে?  তাঁর কাছে ছাড়া আর কাকেই বা বলব? 

বাসায় মোজাক্কির এর ব্যবহৃত জিনিস এখনো আগের মতোই আছে। তিনি সেগুলোকে ছুঁয়ে স্পর্শের বাইরে চলে যাওয়া ছেলেকে খোঁজেন রোজ। 

তার বেদনার্ত স্মৃতিচারণে উঠে আসে সন্তান হারানোর অব্যক্ত বেদনাবিধুর অনুভূতি- 

প্রথম নৌ বাহিনী হেলিকপ্টার কুচকাওয়াজে সে নেতৃত্বে দেয় যেখানে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন প্রধান অতিথি। সে সময় মিশু অসুস্থ ছিল। আমি জানতাম না। সে আমাকে একটু স্যুপ রান্না করে দিতে বললে আমি করে দিই। স্যুপ হাতে নিয়ে বলল, খেতে ইচ্ছা করছে না। খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। ভাবলাম হয়তো কোনো কারণে খেতে চাচ্ছে না। বললাম, খারাপ লাগলে আগামীকালের কুচকাওয়াজে যাওয়ার দরকার নেই। সে বলল, মা আমাকে যেতেই হবে। সব কিছু আমার জন্য প্রস্তুত করা, ওভাবেই সাজানো। আমাকে নেতৃত্ব দিতে হবে। পরদিন সফলভাবে সে তার কাজ করল। সেখানে আমিও ছিলাম। একফাঁকে খেয়াল করলাম, তাকে খুব ফেঁকাশে লাগছে। মুখটা কেমন শুকনো লাগছে। ভাবলাম প্রশিক্ষণ এবং টেনশনে হয়তো এমন হতে পারে। একইদিন আমরা বাহিরে খেতে গেলাম। সেখানেও সে কিছুই খেতে পারলো না। 

জিজ্ঞাস করলাম-  কী হইছে বাবা? বলল, মা বেশ কদিন ধরে কিছইু খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি কালক্ষেপণ না করে সেদিনই তাকে নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। শরীরের চমৎকার গঠন দেখে ডাক্তার কোনো পরীক্ষা না দিয়ে কিছু গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিলেন। আমি তাকে তিন মাসের ওষুধ কিনে দিলাম। 

(কখনো ভেবে দেখেছেন- কে আমি? প্রতিদিন একবার ভাবুন- জীবন বদলে যাবে।) 

সেদিন সে চট্টগ্রাম চলে গেল। ছেলের এই অবস্থা দেখে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। ২৫ ডিসেম্বরের বন্ধে আমি তাকে দেখতে চট্টগ্রাম যাই। সেদিন সবাই মিলে কক্সবাজার বেড়াতে যাই। 

মোজাক্কির বলল, কিছুক্ষণের মধ্যে হেলিকপ্টার নিয়ে কক্সবাজার যাচ্ছি। তোমরা খেয়াল করিও। 

মনটা ভালো ছিল না বলে আমি একদিন পর চট্টগ্রামে ফিরে আসি। রাতে আমাদের সবাইকে নিজে ড্রাইভ করে বোর্ড ক্লাবে খাওয়াতে নিয়ে যায়। সবাই তাদের পছন্দের খাবার খাচ্ছে কিন্ত আমি কিছুই খেতে পারছি না। 

ছেলেটার কী হইছে- এই চিন্তা আমাকে অস্থির করে তুলছে! আমি বার বার মিশুর দিকে তাকাচ্ছিলাম। সে আমার পছন্দের খাবারের অর্ডার দিল। আমি খাবারে মন দিতে পারছি না। হঠাৎ সে ওয়াশরুমে যায়, আমি তার পিছু নিই। বের হবার পর জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে বাবা? বলল, শরীরটা ভালো লাগছে না মা। দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সেখানে সে বমি করল। এন্ডোসকপি করানো হলো। খেয়াল করলাম, ছেলের বৌ কান্না করছে। আমার সামনে কান্না করছে বৌমা এজন্য মিশু ল্যাব থেকে বের হয়ে বৌকে বকা-ঝকা করছিল। 

মোজাক্কির ডাক্তারকে জিজ্ঞাস করল, কী হইছে বলেন? আমরা সৈনিকরা প্রতিদিন মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়েই বের হই, মৃত্যুকে আমরা ভয় পাই না। বলেন আমার কী হইছে। এদিকে বৌয়ের কান্না দেখে এক অজানা আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরে। 
 
তাতক্ষনিক সিদ্ধান্তে ঢাকায় এসে সিএমএইচ-এ নিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় টেস্ট এবং বায়োসপি করতে দেয়া হলো। পাঁচ জায়গায় বায়োপসি করতে দেয়া হলো। কদিন পর দুটো বায়োপসি রিপোর্ট পাওয়া গেল। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে দুটি হাসাপাতালের এ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে রাখা হয়েছে। আমি নৌ বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে দেখা করি। তিনি বললেন, আন্টি মোজাক্কির আমাদের শ্রেষ্ঠ অফিসার, আমাদের গৌরব, অহংকার। বলেন, আপনি কী চান আমার কাছ থেকে। বললাম, আমি টিকিট করেছি রাতের জন্য। আপনি জাস্ট আমাদের ভিসার ব্যবস্থা করে দিন।  তিনি দুই ঘন্টার মধ্যে ভিসা করে দিলেন। 

এই ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ যোগাতে মোজাক্কির এর কোচম্যটরা যেভাবে এগিয়ে আসল তা কখনো ভোলার নয়। আমি সব টাকা পয়সা জোগাড় করলাম। ছেলের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার করেছি। 

নেভি  পাঁচ লাখ দিয়েছে। তার ব্যাচমেটরা অনেক টাকা সংগ্রহ করে দেয়। মোজাক্কির এর নাম শুনে যে যেভাবে পেরেছে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী থেকে যারা তাকে চেনে সিনিয়র-জুনিয়র সবাই এগিয়ে আসল। 

আমি তাদের টাকা নিতে চাইনি। ভাবলাম হয়তো এতো টাকা লাগবে না কিন্তু তারা আমাকে অনেক টাকার দরকার জানিয়ে দিল। ওদের আগ্রহ দেখে আমি না করতে পারিনি। 

সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালে নিয়ে গেলাম। সেখানে সিটিস্ক্যান করানো হলো। ডাক্তার বললেন, খুব একটা ভালো লাগছে না। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। যদি পাকস্থলির বাইরে জীবানু না ছড়ায় তাহলে এখনই অপারেশন করতে হবে। তারা মিশুকে বললো, তুমি লাকি। বাইরে ছড়াইনি।  

এ কথা শুনে খুব রিলাক্সড মুডে মোজাক্কির ওটি-তে গেল। অনেক বাঙ্গালী আসল খাবার নিয়ে। এ্যাম্বাসী থেকে লোক আসল। সবাই খবর নিয়ে আসছে। সেখানকার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের একজন সিনিয়র অফিসার আমার জন্য খাবার নিয়ে এল। 

সফল অপারেশন হলো। অপারেশন শেষে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসলাম। ডাক্তাররা বললেন, ছয়টি কেমো দিতে হবে। ক্যান্সারের জীবানু যাতে কোথাও সুপ্ত অবস্থায় না থাকে সেজন্য এই কেমো দিতেই হবে। 

২১ দিন পর পর ৫টি কেমো দেয়া হলো। ৬ নম্বর কেমো দেয়ার আগে মোজাক্কির এর পেটে পানি জমে গেল। প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে। দ্রুত সিএমএইচ এ নিয়ে গেলাম। তারা দেখে বললো, আবার সমস্যা দেখা দিয়েছে। পানিতে আবার জীবানু দেখা যাচ্ছে। শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। 

ডাক্তার বললেন, কেমোর ধরণ পরিবর্তন করতে হবে। এ অবস্থায় বিশ্বের সেরা চিকিৎসা নিলেও বড়জোড় এক বছর বাঁচানো সম্ভব হবে।  

আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস- আল্লাহ অবশ্যই আমার ছেলেকে সুস্থ করবেন। 

আমার ভাই ফজলুল কাদের তার ছেলের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর গেলে তার সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করি। শুনে সে পাগলের মতো হয়ে গেল। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিল। সবজায়গায় একই উত্তর- বড়জোড় এক বছর বাঁচতে পারে। একপর্যায়ে ভাই খবর পেল, ভিয়েতনামে ভালো চিকিৎসা আছে। সেখানে জাপান-ভিয়েতনাম ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের অনেক সুনাম। এরইমধ্যে অনেক রোগী ভাল হইছে। স্কাইফিতে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। তারা সাহস দিলেন। ১৬ জুন ২০১৭: দ্রুত ভিয়েতনাম চলে যাই। 

সর্বশেষ একটা পরীক্ষা ছিল যেটা বাংলাদেশে করা হয়। ভিয়েতনামের ডাক্তার বলছিলো, ওই পরীক্ষার রেজাল্ট যদি নেগেটিভ হয় তাহলে বাঁচার সম্ভাবনা নেই। দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা ছিল নেগেটিভ। ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। যে কেমো দেয়ার কথা ছিল সেটা না দিয়ে ২৬ জুন ২০১৭ অন্য কেমো দেয়া হলো। ধীরে ধীরে তার শরীর আরও খারাপ হতে লাগল। ২ জুলাই তার শরীর ভীষণ খারাপ হলো। 

 চোখ মুছে ড. সালেহা কাদের ফের শুরু করলেন-  দিনটি ছিল ঈদের দিন। দেশ থেকে একটা পাঞ্জাবী নিয়েছিলাম সেটা পরে মোজাক্কির নামাজ পড়ল। যতই ব্যস্ত থাকুক মোজাক্কির কখনো নামাজ ত্যাগ করেনি। 

২ জুলাই রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিলাম হয়তো স্বাভাবিক, ঠিক হয়ে যাবে।  ২ তারিখ গভীর রাতে ডাক্তার তাকে শ্বাসের মাস্ক দিলেন। মোজাক্কির ইশারায় কাগজ-কলম চাইল। সে লিখল- একটা শার্ট, প্যান্ট আর জুতা দিতে। বিষয়টি আমি ঠিক বুঝিনাই। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। ইচ্ছা করছিল, চিৎকার করে কান্না করি। চোখের জলতো অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। একদৃষ্টে মোজাক্কির এর দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলাম।  

হঠাৎ মোজাক্কির বলল, আই অ্যাম সরি মা, ইট ওয়াজ আ ড্রিম। 

আমি দ্রুত ডাক্তার ডাকি। 

ডাক্তার বলছিলো, ব্রিদ স্লোলি মিশু...। 

তারপর একটু ঘুমাই সে। হঠাৎ জেগে উঠে বলল, একটা স্বপ্ন দেখেছি মা। বিরাট একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, ওসব কিছু না, বাদ দাও। তুমি ঘুমাও। ভিতরটা আমার ভিষণ মোচড় দিয়ে উঠল। আমি বুঝতে পারিনি যে, তখন মোজাক্কির আমাকে ছেড়ে চিরতরে চলে যাচ্ছে। আমি তাকে জাড়িয়ে ধরলাম। বার বার বলছিলাম তুমি ভালো হয়ে যাবে। 

ডাক্তার আমাকে ডেকে বললেন, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসযন্ত্র ( ভেনটিলেশন যন্ত্র ) না দিলে রাত্রে বাঁচানো যাবে না। মুখে কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নাড়লাম। মুখে নল ঢুকিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হলো।  সে বারবার সেটা খুটে ফেলতে চাইছিল।  নার্স তার হাত ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর আর নড়াচড়া করলো না। একজন ডাক্তারকে স্পেশাল পে করব বলে পাশে বসিয়ে রাখলাম।  

জুলাই ৩, ২০১৭। সোমবার সকাল ১০টা ১৩ মিনিট।  বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ১০ মিনিট। চলে গেল মোজাক্কির। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল আমার। শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে কানের কাছে ঝঁকে কালেমা এবং তওবা পড়ালাম। শরীর কাঁপছে; চোখ দিয়ে অঝোড়ে পানি ঝড়ছে। নির্বাক আমি ছেলের মুখ পানে চেয়ে থাকলাম! 

খেয়াল করলাম,  বারবার সালেহা কাদেরের চোখ ভিজে যাচ্ছে। কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছে।  

স্বজন ও সহকর্মীরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রহণ করেন মিশুর নিথর দেহ। সবাই আশাবাদী ছিলেন, মৃত্যুকে আরেকবার পরাজিত করে সুস্থ শরীরে ভিয়েতনাম থেকে ফিরে আসবেন সকলের প্রিয় মোজাক্কের। কিন্তু সবার দোয়া, শুভকামনা ও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে অনন্ত যাত্রার পথে বাংলাদেশের কোলে ফিরেছেন মোজাক্কির হোসেন খান মিশু।    

৫ জুলাই প্রচুর মানুষের উপস্থিতিতে জানাযা শেষে সামরিক মর্যাদায় বাদ আসর বনানী কবরস্থানে চিরবিদায় জানানো হলো মিশুকে।

 

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন:

২০০২ সালের ১১ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন লে. কমান্ডার এম. মোজাক্কির হোসেন খান। প্রশিক্ষণ চলাকালে অসাধারণ দক্ষতার জন্য নেভাল একাডেমীতে তাকে ক্যাডেট ক্যাপ্টেন পদে নিযুক্ত করা হয়। এরপর ২০০৪ সালের ১ জুন  নির্বাহী শাখাতে কমিশন লাভ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নেভিতে সাব-লেফট্যানেন্ট এ পদোন্নতি লাভ করেন। ক্যাডেট প্রশিক্ষণে অসামান্য ফলাফলের জন মোজাক্কির সম্মানসূচক  Sword of Honour    (শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণনার্থীর স্বীকৃতি) লাভ করেন এবং তার ব্যাচে প্রথম স্থান লাভ করেন ।  

২০০৪ সালে কমিশন লাভের পর তিনি BNS ISSA Khan Chittagong,  BNS Shaheed Moazzom Kaptai এবং BNS Titomir   খুলনায় প্রাথমিক অফিসার কোর্স সম্পন্ন করেন।

মৌলিক কোর্স সমূহের মোজাক্কির মেধাতালিকায় ৮০ শতাংশেরও বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান ধরে রাখেন।  কোর্স শেষে তিনি  BNS Ali Haider  এ   নাবিকের দায়িত্ব পালন করেন।  সমুদ্র পাহারায় থাকাকালীন তিনি একটি সম্মেলনে যোগ দিতে ওমান ভ্রমন করেন। সফলতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ কোর্স সমাপ্তির পর পুরস্কার হিসেবে তিনি সাব লেফট্যানেন্ট হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।  এরপর তিনি রনতরী কর্মকর্তা হিসেবে BNS Meghna  তে যোগ দেন। 

ছোটবেলা থেকে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় তার স্বপ্নের কথা বলতেন। একদিন তার স্বপ্ন পূরনের সুযোগ আসে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে একটি বিমান উড্ডয়ন শাখা গড়ে তোলার এবং বৈমানিক হিসেবে কিছু মেধাবী তরুণদের প্রশিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।  অতীতের সব কোর্সের সফল সম্পন্নকারী এবং অসাধারণ পেশাদারী রেকর্ডের জন্য মোজাক্কির উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। একজন পাইলট হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য তিনি বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স এ যোগ দেন। 

স্বপ্ন পূরণে নিজেকে সম্পূর্ণ সপে দেন তিনি। তার আগ্রহ এবং সদিচ্ছা তাকে  লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়তা করে। অসংখ্য বিমান বাহিনী অফিসারদের মধ্যে একজন নেভি অফিসার হয়েও তিনি সর্বোচ্চ নাম্বার অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ২০০৯ সালে নির্বাহী অফিসার হিসেবে খুলনা নেভাল  BNS Daulat  এ নিযুক্ত হন। 

এরইমধ্যে ২০১০ সালে বিমান বাহিনীর পাইলট প্রশিক্ষণে যোগ দেন। কোর্স শেষে একই বছর কৃতীত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য একজন যোগ্য হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন  করেন।  

২০১০ সালে তিনি নেভাল এসোসিয়েশনে যোগ দেন। মোজাক্কির বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন নেভাল এসোসিয়েশনের উন্নয়নে। শিশু সংস্থাগুলোর উন্নয়নের জন্য রাত-দিন পরিশ্রম করেন তিনি। এসময় নেভী সিদ্ধান্ত নেয় ইটালি থেকে দুটি অড ১০৯ Helicopter  কেনার। চৌকষ পাইলট মোজাক্কিরকে ইতালী পাঠানো হয় AW 109 Helicopter  এর প্রশিক্ষণের জন্য। 

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি এই বিশেষ হেলিকপ্টারের স্পেশাল পাইলট হিসেবে স্বীকৃতি পান। ২০১১ সালে দুটি মডার্ন এয়ারক্রাপট আনা হয় বাংলাদেশে । এতে বাংলাদেশি পাইলট হিসেবে মোজাক্কির সর্বপ্রথম এই দুটি মডার্ন এয়ারক্রাপট আকাশে উড্ডয়ন করেন। 

২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান যোগ্যতর হেলিকপ্টার প্রশিক্ষক Qualified Helicopter instructor (QHI)  কোর্স করতে। সফলভাবে কোর্স শেষ করে তিনি প্রথম বাংলাদেশি AW 109 Helicopter flying instructor  হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। 

একসময় মোজাক্কির বাংলাদেশ নেভীর অনভিজ্ঞদের প্রশিক্ষন দিতেন এবং তাদেরকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে পানিগর্ভে হেলিকপ্টার সুরক্ষা প্রশিক্ষণে তিনি  মালয়েশিয়া যান। এটা এমন একটি প্রশিক্ষণ ছিল যেখানে তিনি শেখেন সমুদ্রে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে কীভাবে পানি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হয়।  বিদেশি প্রশিক্ষণদাতাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মোজাক্কির দ্রুত দক্ষ হয়ে উঠেন। 

২০১৬ সালে একটি প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতিতে মোজাক্কির BNS Bangabandhu- তে হেলিকপ্টার ডেক লেন্ডিং প্রদর্শণ করেন। এটি ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং- যাতে বাংলাদেশ নেভী প্রধান তাকে নিজ হাতে লিখিতপত্রে প্রশংসা এবং তাকে উদ্দেশ্যে করে বিভিন্ন সম্মানসূচক কমেন্ট করেন। যার দ্বারা মোজাক্কির তার জুনিয়রদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে রইলেন। এছাড়া তিনি ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বিজয় দিবস উড্ডয়ন মহড়ায়ও অংশগ্রহণ করে তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।   

( ভালোর সাথে থাকুন, ইকরা নিউজ পড়ুন )  

শেয়ার করুন:-