ভুলবে না সন্দ্বীপবাসী

মোশাররফ হোসেন

৫৮২

প্রকাশিত: ২১:৩০, ২ ডিসেম্বর ২০১৯  

শেয়ার করুন:-
দ্বীপবন্ধু

দ্বীপবন্ধু

২০ অক্টোবর। এই দিনে সন্দ্বীপের কোলে নেমে আসে শোকের ছায়া। ২০০১ সালের এ দিন সন্দ্বীপ হারায় তার প্রিয় মানুষটি।

দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানকে এর আগে অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় সিঙ্গাপুরে। তাঁর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় সবাই।

কিন্তু নিয়তির নিঠুর বিধান। তিনি আর ফিরলেন না। সব চাওয়া-পাওয়ার অতীতে, উর্দ্ধলোকে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবরে শোকবিহ্বল হয়ে পড়ে সন্দ্বীপবাসী। লাখো মানুষের চোখের জলে সিক্ত হয়ে তিনি চলে যান পরপারে। 

প্রতি বছর এই দিনে শুভানুধ্যায়ীরা তাদের প্রিয় বন্ধুর কথা স্মরণ করেন। মিলাদ-মাহফিল, কোরআন খতম ও কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আত্মার শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। 

১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘ইকরা নিউজ ২৪’ পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বীপবন্ধুর জন্য রইল বিশেষ প্রীতি, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।

পিতা মৌলভী হাবিবুর রহমান ও মাতা বিবি আমেনা বেগমের কোল আলো করে ১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্দ্বীপের কুছিয়ামোড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন।  

পেশার খাতিরে আমার সুযোগ হয়েছিল সন্দ্বীপের প্রায় সব গ্রাম চষে বেড়ানোর। পরিচিত কিংবা অপরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলে আমি কৌতুহলবশেঃ আলোচনা করি দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমান প্রসঙ্গে।  

বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সব শ্রেণী-পেশার মানুষ, দল-মত নির্বিশেষে এই ত্যাগীমানুষটিকে কতটা আপন ভাবেন, কতটা ভালোবাসেন!

অনেকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি তিনি কতটা তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। একজন  কতটা অকৃত্রিম হলে সাধারণের সঙ্গে এতটা নিরেট আর নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন!  

শৈশব থেকেই শুনতে শুনতে মনের ভিতরে গেঁথে গিয়েছিল ‘মুস্তাফিজুর রহমান’ নামটি। ক্রমেই তাঁকে জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। তাঁর সম্পর্কে যতই জানতে পারি ততই  অবাক হতে থাকি।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যবোধের ক্ষেত্রে তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সব কর্মকান্ডে সন্দ্বীপপ্রেমের একটি পরিচ্ছন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়।  

মুুস্তাফিজুর রহমানের জীবন-দর্শন এবং রাজনৈতিক জীবনপ্রবাহের মূলেই ছিল হিংসা ও অহঙ্কারকে নির্মূল করে মানবিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মেলবন্ধন ঘটিয়ে মেহনতি মানুষের হৃদয় জয় করা এবং সামগ্রিক অর্থে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত,সবার জন্য সুখী ও কল্যাণকর সন্দ্বীপ প্রতিষ্ঠা। 

অকাতরে দান করতেন প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে...

মুস্তাফিজুর রহমানের সামাজিক দায়িত্ববোধ ছিল অনুসরণীয়। মানুষকে সাহায্য করতে তিনি ছিলেন মুক্তহস্ত। অকাতরে দান করতেন প্রকাশ্যে এবং গোপনে।

তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েকশ ব্যক্তির কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিক ছিল তার অতিথিপরায়ণতা।

অনেকের মতে চারদিকে সাগর-নদি পরিবেষ্ঠিত, যুগযুগ ধরে বঞ্চিত, অনুন্নত, ভাগ্যাহত সন্দ্বীপ জনপদে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন  মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁর আগমন বার্তা ঘুমন্ত সন্দ্বীপবাসীকে জাগিয়ে তুলেছিল।

দ্বীপবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব, তিনি শুধু সন্দ্বীপের স্বপ্নদ্রষ্টাই ছিলেন না; অনন্যসাধারণ এক ঐক্যের বন্ধনে সন্দ্বীপের আপামর জনসাধারণকে একতাবদ্ধ করে একটি উন্নত দ্বীপ গঠনের সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘ লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

তাঁর আগে-পরে বহু রাজনীতিবিদ এসেছেন। কিন্তু এমন করে কেউ সন্দ্বীপবাসীকে জাগাতে পারেনি। তাঁর অবদানের জন্য সন্দ্বীপের ইতিহাসে এক অনিবার্য স্থান যথার্থই দখল করে আছেন।

সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষের স্বার্থসংক্রান্ত প্রতিটি ইস্যুতে মুস্তাফিজুর রহমান নির্ভীকভাবে এগিয়ে এসেছেন। তিনি সন্দ্বীপের উন্নয়নের ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত।

শিক্ষার প্রতি ছিল দুর্নিবার আকর্ষণ আর তাই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অগণিত স্কুল-কলেজ। সাহায্য করেছেন অকুন্ঠচিত্তে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তিনি সাধারণ মানুষ-মুটে, মজুর, কৃষাণ-কৃষাণী, এমনকি পথের ভিখিরি নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে অবলীলায় মিশে যেতেন । কথা বলতেন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে। ক্ষুধার্ত, নিরন্ন, আশ্রয়হীন মানুষকে কাছে টানতেন পরম মমতায়। 

এ চিরচেনা সমাজের আর দশজনের মতো ‘মুস্তাফিজুর রহমান’ এখন শুধু ব্যক্তি মানুষের নাম নয়, প্রতীতির আলোয়  তিনি এখন অন্যতর, সর্বজনীন। কল্যাণময় দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি আজ পরিশীলিত সত্যের, মানবতার মূর্ত প্রতীক।

রাজধানীর আয়েশী জীবন তাঁকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। 

সন্দ্বীপের মানুষ তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করবে সেটিই সবার প্রত্যাশা।  

শেয়ার করুন:-