মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন: জীবন ও কর্ম

অধ্যক্ষ মুকতাদের আজাদ খান  

২৩৮

প্রকাশিত: ২৩:০৪, ২০ এপ্রিল ২০২০  

শেয়ার করুন:-
মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন

মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন

৮ এপ্রিল ২০১৫। সকাল ৭টার দিকে 'সাপ্তাহিক আলোকিত সন্দ্বীপ' পত্রিকার কওমী মাদরাসা শাখা প্রতিনিধি ইব্রাহীম অপু ফোনে বলল ভাইয়া মোয়াজ্জেম স্যার মারা গেছেন। আমি তখন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সুগন্ধা বীচে আবদুল্লাহ আজাদ খান ও আলো আজাদকে নিয়ে প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগরত। 

আমি অপুকে নিউজ আইডি Alokito Sandwip এ কিভাবে সংবাদ যাবে তার নির্দেশনা দিয়ে ফোন রাখতেই কল করলেন অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন। তিনি বিনয়ের সাথে বললেন মুকতাদের সাহেব মোয়াজ্জেম স্যার মারা গেছেন নিশ্চয়ই আপনি জানেন। একটু দেখেন সংবাদটা কোন টিভিতে করা যায় কিনা। আমি উত্তর দিলাম এনটিভিতে কথা বলছি। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম মোয়াজ্জেম স্যারকে নিয়ে একটা ফিচার লিখব।

আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজের সাংগঠনিক কমিটির সদস্য ছিলেন মোয়াজ্জেম স্যার। আমি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোয়াজ্জেম স্যার আমাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে সুপরামর্শ দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে সহযোগীতা করেছিলেন।

ওই সময় থেকে স্যার আমাকে এমনভাবে সম্বোধন করতেন যেন আমি স্যারের পরম আপনজন। একাধিকবার অনুরোধ করার পর ২০০৬ সালের ৩ জুলাই স্যার স্বহস্তে দুই পৃষ্ঠায় লিখে উনার জীবনী আমাকে দিয়েছিলেন। স্যারের সেই লেখাটির ওপর ভিত্তি করেই স্যারের জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখা।

সন্তেষাপুর উচ্চ বিদ্যালয়, আয়েশা ওবায়েদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, জেবেন নূর সুলতান উচ্চ বিদ্যালয় এবং এ কে একাডেমি-গাছুয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন আলহাজ মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন।

সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম-এর উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মোয়াজ্জেম স্যার সন্তোষপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি থেকে সেন্টার পরীক্ষায় পাশ করার পর ওই এলাকায় কোন মানসম্মত স্কুল না থাকায় উনার পিতামহ উনাকে ভর্তি করান খন্তার হাট এমই স্কুলে।

এই স্কুলে পড়াকালীন তিনি প্রথমে রাজের গো পরে নূর হোসেন মাস্টারের বাড়িতে লজিং ছিলেন। ঐ সময়ে খন্তার হাট এমই স্কুলে প্রধান শিক্ষক ছিলেন ইসমাইল হোসেন খান প্রকাশ ইসমাইল ডাক্তার। এই স্কুল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাশের পর তিনি কাটগড় গোলাম নবী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ঐ স্কুল থেকেই ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

স্যার তাঁর জীবনীতে লিখেছেন ‘ছাত্রাবস্থায় পড়ালেখার চেয়ে ফুটবল খেলার প্রতি আমার খুবই ঝোঁক ও নেশা ছিল। যার কারণে ক্লাসে পড়ালেখার জন্য শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের অনেক বকুনি ও বেত হজম করতে হয়েছে’।

ম্যাট্রিক পাশের পর আর্থিক অনটনের কারণে সে বছর কলেজে ভর্তি হতে না পেরে ২৪ টাকা বেতনে সন্তোষপুর এমই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন। পরের বছর চৌমুহনি কলেজে আইএ ভর্তি হয়ে লজিং থেকে পড়ালেখা করে ১৯৫০ সালে আইএ পাশ করে ঐ কলেজেই বিএ ভর্তি হন।

১৯৫২ সালে অর্থনীতিতে বিএ ফেল করেন। আর্থিক অনটনের কারণে পুনরায় ভর্তি সম্ভব না হওয়ায় সন্তোষপুর এমই স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ওই স্কুলে ৪ বছর চাকুরী করে বিদ্যালয়টিকে এমই স্কুল থেকে জুনিয়র হাই স্কুলে পরিণত করেন। পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে মতানৈক্য হওয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।

স্যারের বন্ধুবর মাস্টার নোমান ও গাছুয়ার সাবেক চেয়ারম্যান আনছারুল হকের অনুরোধে ২৫ টাকা বেতনে গাছুয়া এমই স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে ১৯৫৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি যোগদান করেন।

১৯৬০ সালে পর্যায়ক্রমে গাছুয়া এমই স্কুলকে জুনিয়র হাই স্কুলে পরিণত করে একই সালে এক্সটারনাল কেনিডেট হিসেবে বিএ পরীক্ষা অংশগ্রহণ করে বিএ পাশ করেন।

স্যার, জীবনীর একাংশে লিখেন বহু কষ্টে নির্মাণ করা ৮০ হাত লম্বা দক্ষিণ মূখী স্কুল ঘরটি ঘূর্ণিঝড়ে মারাত্মক বিধ্বস্থ হয়ে পাশের ডোবাই নিমজ্জিত হওয়ার পর বিদ্যালয়ের আপনজন মৌলভী ফয়েজ আহম্মদ চৌধুরী, মুজিবুল হক, মৌলভী আবদুল খালেক ও হাজী জহির আহমদকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে চাকুরীরত এম. ওবায়দুল হকের নাসিরাবাদস্থ বাসায় গিয়ে উঠেন। দুদিন তাঁর বাসায় রেখে আলাপ আলোচনা করে স্কুল ভবন পাকাকরণে সম্মতি দেওয়ার পাশাপাশি একক আর্থিক অনুদানে দ্বিতল ভবন সম্পন্ন করেন সাবেক এমপি এম.ওবাইদুল হক।

১৯৬৪ সালে এ কে একাডেমি গাছুয়ায় নবম শ্রেণি খোলা হয় এবং ঐ সালের জুলাই মাসে কুমিল্লা বিএড কলেজে ভর্তি হয়ে কোর্স সম্পন্ন করে ১৯৬৫ সালে পুনরায় বিদ্যালয়ে স্বপদে যোগদান করেন।

১৯৬৫ সালে ওবাইদুল হক সাহেবের অনুদানের স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা পরিদর্শকের প্রস্তাবে এম.ওবাইদুল হকের পিতার নামানুসারে বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় আবদুল খালেক একাডেমি প্রকাশ এ কে একাডেমি-গাছুয়া।

স্যারের তথ্য মতে, তৎসময়ে এটাই ছিল সন্দ্বীপের একমাত্র দ্বিতল ভবন সম্পর্ণ হাই স্কুল। এরপর চাহিদার আলোকে ২০০৩-২০০৪ সালে এই দ্বিতল ভবনকে তিনি তিন তলা ভবনে পরিণত করেন। স্যার লিখেন 'এ কে একাডেমি-গাছুয়া নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমার কী পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সাধনা ছিল তা বর্ণনা করা আদৌ সম্ভব নয়।' এ কে একাডেমি গাছুয়ায় তিনি টানা ৩৯ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর টানা ৪ বছর জেবেন নূর সুলতান উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর আয়োশা ওবায়েদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও তিনি প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৮ সালে মোয়াজ্জেম স্যার পবিত্র হজ ব্রত পালন করেন। শিক্ষাকতার পাশাপাশি তিনি সমাজসেবায়ও নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সমাজ কর্মের অংশ হিসেবে উত্তর সন্দ্বীপ কলেজ সাংগঠনিক কমিটির সদস্য, এ কে একাডেমি-গাছুয়া পরিচালনা কমিটির সভাপতি, গাছুয়া সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, গাছুয়া সন্তোষপুর বায়তুর মামুর জামে মসজিদ পরিচলান কমিটির সভাপতি ও গাছুয়া সন্তোষপুর জামিয়াতুল ফালা জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে সততা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

আলহাজ মাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন ৮ এপ্রিল ২০১৫ সালে ভোর সোয়া ৫টার দিকে সন্দ্বীপেই ইন্তেকাল করেন। প্রসঙ্গত, উনার স্ত্রী রেহেনা বেগম মৃত্যুবরণ করেন ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন পুত্র সন্তানের জনক। প্রথম পুত্র মোঃ সাজ্জাদ হোসেন মুকুল (ব্যবসায়ী), দ্বিতীয় পুত্র মোঃ শওকত হোসেন শ্যামল (বেসরকারী কর্মকর্তা), তৃতীয় পুত্র মোঃ মোকাম্মেল হোসেন মিলাদ (ব্যবসায়ী)।

লেখক- শিক্ষার গুনগত মানোন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ 'সাপ্তাহিক আলোকিত সন্দ্বীপ' পত্রিকার সম্পাদক।

শেয়ার করুন:-