‘সন্দ্বীপবাসীর টাকার অভাব নেই, দরকার শুধু পড়াশোনা’

মোশাররফ হোসেন

১৪৩১

প্রকাশিত: ১০:২৮, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:৩৫, ২০ জুন ২০২০

শেয়ার করুন:-
ছবি: দ্বীপকথা

ছবি: দ্বীপকথা

শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন। চেয়ারম্যান, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় (চন্ডিগড়) থেকে ১৯৮৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ঐতিহ্যমন্ডিত ও সুশিক্ষিত এক পরিবারে তাঁর জন্ম সন্দ্বীপে, ১৯৫৬ সালে। বাবা প্রয়াত শামসুল হুদা এবং মা প্রয়াত সফিয়া বেগম। 

সন্দ্বীপের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্বীপকথা’য় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। সেখানে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মোশাররফ হোসেন।  সাক্ষাৎকারের কিছু চুম্বক অংশ ইকরা নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।  
 
আপনার পরিবার, শিক্ষার কথা বলুন

১৯৫৬ সালে আমার জন্ম। আমাদের বাড়ি সন্দ্বীপের মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নে। দক্ষিণ সন্দ্বীপ। শিবেরহাটের কাছে। কেরামতিয়া মাদ্রাসার উল্টোদিকে। মৌলভী সৈয়দ আহমদের বাড়ি। শহীদ জসিমের বাড়ি - ছোট চাচা যিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। দাদার নাম মৌলভী সৈয়দ আহমদ। কারগিল হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

আমার বাবার নাম শামসুল হুদা। মা সফিয়া বেগম। নানার বাড়ি মগধরা। বাবা ছিলেন কলকাতায়। দেশ ভাগের পর ঢাকায় আসেন। পুরান ঢাকায়। বাবা ইনস্যুরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী করতেন। তিনি ঢাকার ওয়ারি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাবার চাকুরীসূত্রে সমসময় আমাদের ঢাকায় বসবাস।  

আমার একমাত্র সন্তান নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করে লন্ডনের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। আমার স্ত্রী রুহ আফজা রুহী বিভিন্ন প্রজেক্টে কনসালটেন্সির কাজ করে ।   

সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সোশিউলজি থেকে মাস্টার্স এবং ব্যাংককের এআইটি থেকে জেন্ডার স্টাডিজ-এ এমএসসি সম্পন্ন করে। ১৯৯০ সালে আমাদের বিয়ে হয়। শশুরবাড়ি  লক্ষ্মিপুর- এখন ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়।  

আমরা চার ভাই পাঁচ বোন। বড় ভাই নিউইয়র্কে থাকেন। বড় ভাইয়ের ছেলে নিউইয়র্ক পুলিশের অফিসার। আমাদের সবার বড় তিন বোন। বড় বোন মেজো বোন এবং ছোট বোন বাংলাদেশে।

বড় বোনের স্বামী জীবন বিমায় চাকুরী করতেন। মেজো বোন ইডেন কলেজের প্রফেসর ছিলেন। তিনি ইডেন কলেজ থেকে অনার্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। তার স্বামী প্রকৌশলী। সেজো বোন লন্ডন থাকেন। তিনি পলিটিক্যাল সায়েন্সে গ্রাজুয়েট। তার স্বামীও প্রকৌশলী।

তারপরের বোন কানাডায় থাকেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্সে গ্রাজুয়েট। আমার ছোট ভাই আমেরিকায় গ্রাজুয়েশন করেছে। কম্পিউটার সায়েন্সে। বাংলাদেশে ব্যবসা করে। সর্বকনিষ্ঠ ভাই আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় থাকে। ওয়াশিংটনে কাজ করে। আইটি স্পেশালিস্ট। 

আমি সিদ্ধেশ্বরী স্কুল এবং রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। ১৯৬৮ সালে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি। ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন করি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ষষ্ট স্থান অর্জন এবং মেট্রিকে প্রথম বিভাগ- মানবিক শাখায়।

তারপর ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হই। সেশনজটের কারনে ১৯৮১ সালে মাষ্টার্স শেষ করি। মাস্টার্স পরীক্ষার পরে ভারত সরকারের বৃত্তি লাভ করি। ভারতের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় (চন্ডিগড়) থেকে ১৯৮৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করি।

এরপর ১৯৮৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, গাজিপুরে (এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস) লোক প্রশাসনের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ। সেখানে দুই বছর চাকুরী করি।

তারপর ১৯৮৯ সালে একইসাথে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি পাই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি। মাঝে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল ছুটি নিয়ে ব্যাংকক এর এআইটি (Asian Institute of technology, Bangkok ) - তে যোগ দেই। ঢাবিতে দুই বছর ধরে লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন ছাড়াও ২০১৬ সালের জুলাই মাসে মানবাধিকার কমিশনের মেম্বার হই। (Appointed a member by the honourable President.)

 ক্রিড়া নিয়ে আপনার ভাবনা ?

সবধরনের খেলাধুলায় আমার অংশগ্রহন ছিল। তবে ক্যাডেট কলেজে বেশিরভাগ সময় ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলতাম। কলেজ ক্রিকেট টিমের সদস্য ছিলাম। সব খেলায় খেলতাম তবে ক্রিকেট এর প্রতি বেশি ঝোঁক ছিল। এখন আর আগের মতো টিভিতে খেলা দেখিনা। বয়সের কারনে স্ট্রেস এখন ভালো লাগেনা। তাই টিভিতে খেলা দেখা হয়না। 

অবসরে কী করেন ?

অবসর সময়ে বন্ধুবান্ধবের সাথে গল্প করি। ঘুরে বেড়াই। আগের মতো না হলেও মাঝে মাঝে সিনেমা দেখা হয়। বিশেষ করে বিদেশে গেলে সিনেমা দেখি। থ্রিলার, গল্পভিত্তিক, হ্যারিপটারের সিনেমা দেখতে খুব পছন্দ করি। হিন্দী, বাংলা, ইংলিশ সব মুভিই দেখা হয়। হ্যারি পটারের বই আরো সাত আট বছর আগে পড়েছি। আমার ছেলেটা হ্যারি পটারের বইয়ের পাগল ছিল। একদিন মনে হলো আমি পড়ে দেখি। মুগ্ধ হয়ে সেই থেকে শুরু পড়া। অনেকগুলো পড়লাম। 

এছাড়া প্রত্যেক সোমবার ডেইলি সান পত্রিকায় পোস্ট এডিটরিয়াল লিখা হয়। লেখাগুলো জড়ো করে বই আকারে বের করার ইচ্ছা আছে। বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব শেষ হলে এই কাজ শুরু করব। 

মানবাধিকার কমিশনের সদস্য হতে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়া হয় ?  

মানবাধিকার কমিশন একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া আছে, বিধিবদ্ধ আইন আছে। সেখানে সিলেকশন কমিটি আছে। প্রধান হচ্ছেন স্পিকার অব পার্লামেন্ট। তারা সিলেক্ট করে। সমাজে যাদের অবদান আছে, মানবাধিকারের প্রতি যাদের বোধ আছে, তাদেরকে সিলেক্ট করা হয়। 

আপনার প্রিয় লেখক  

আগে যেমন ক্রেজ ছিল এখন আর নাই। বিভিন্ন বিষয়ে জড়িত হয়ে যাবার কারণে এখন আর তেমন পড়া হয়না। তবে সুনিলের বই পাইলেই পড়ার চেষ্টা করি। 

বিলেতে স্থায়ী হলেন না কেন?

প্রায় ২০টি দেশ ভ্রমন করি। কর্মসূত্রেও বিভিন্ন দেশে যাই। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডে ইমিগ্র্যাশন নিয়েছিলাম। ছয় মাস থেকে ফিরে আসি। ভালো লাগে না। বাংলাদেশকে ভালোবাসি কিন্তু আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাস করি। মানুষের অধিকার আছে যেকোন জায়গায় থাকার। যে কোন জায়গাকে হোম বানাতে পারে। যেমন আব্বা সন্দ্বীপে পড়াশোনা করেছেন আবার কলকাতায়ও পড়াশোনা করেছেন। দেশ আলাদা না হলে হয়তো সেখানে থেকে যেতেন। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা থেকে ফিরে এসে ঢাকায় সেটেল্ড হন। ঢাকায় চাকুরী করেন। সেই সুবাদে আমরাও ঢাকায় আসি। 

সন্দ্বীপে যাওয়া হয় কি না?

ছোটবেলায় যখন মায়ের সাথে শীত কালে সন্দ্বীপ যেতাম সবাই বলত বিদেশী আসছে। তখন কুমিরা পর্যন্ত ট্রেনে যেতাম। তারপর সাম্পানে করে সন্দ্বীপে। তখন রিক্সা ছিল না। গরুর গাড়ি ছিল। নানার বাড়ি যেতাম গরুর গাড়ি করে। 

১৯৯৩ সালে আব্বা মারা যান। ’৯২ সালে আব্বাকে তার স্কুল কারগিল হাইস্কুল দেখানোর জন্য সন্দ্বীপ নিয়ে যাই। সেসময় কারগিল হাইস্কুলের মাঠ অর্ধেক নদিগর্ভে বিলিন হয়ে যায়। তখন সন্দ্বীপ টাউনের আশেপাশে কিছু রাস্তা ছাড়া আর কোন রাস্তা পাকা ছিলনা। 

ছোটবেলায় সন্দ্বীপে প্রতিবছর যাওয়া হতো। এখনও সন্দ্বীপে যাওয়ার ইচ্ছে হয় কিন্তু কেমন জানি যাওয়া হয় না। ছোটবেলায় আমার কাজীনরা ছিল। একটা ভিন্নরকম আমেজ ছিল। এখন সবাই সহরবাসি। আমাদের বাড়িতে শুধু চাচা থাকেন। আমার আব্বারা সাত ভাই ছিলেন । সবাই মারা গেছেন। শেষে মারা গেলেন ড. রাজীব হুমায়ুন। 

সন্দ্বীপে তখন খুব বেশি যানবাহন না থাকায় ধুর (জমির মাঝখানে চলাচলের সরু পথ) দিয়ে স্বল্প সময়ে নানার বাড়ি যেতাম। এখনো আমি সেসব পথ দিয়ে একা একা যেতে পারব।

শিবের হাটে ‘বিনে শাহ’র দোকানের মিষ্টি এখনও মুখে লেগে আছে। বিখ্যাত বালুশাই এবং একধরনের মিষ্টি ছিল যার ভিতরে নারকেল কুচি দেয়া থাকত - অসাধারন ছিল সেসব মিষ্টি। চাচাদের কাছে গেলে মুটো করে টাকা দিত। গুনে দেখার পর দেখতাম অনেক টাকা। আমরা কাজিনরা মিলে খুব খাইতাম। 

সন্দ্বীপের শিক্ষা নিয়ে আপনার ভাবনা।      

সন্দ্বীপের শিক্ষার মান বাড়াতে চাইলে সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে কমিউনিটি কে এগিয়ে আসতে হবে। একসময় বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ কমিউনিটি চালাত। সরকার অধিগ্রহন করার ফলে একটি বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিকভাবে যদি স্কুল-কলেজ চলত, কমিটি গঠন হতো তাহলে স্কুলগুলো বেশি মনিটর করা যেত। তাছাড়া প্রাচুর্য্যেরও অভাব রয়েছে। আর এখন সন্দ্বীপের বাইরে পড়াশোনার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। 

শিক্ষার মান বাড়াতে চাইলে পরিবার থেকে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারই রেসপনসিবল। বাবা-মাকে দেখতে হবে ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করে কিনা। এছাড়া খেলাধুলার প্রতি আরো মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন স্কুলে টুর্ণামেন্টের আয়োজন করা যেতে পারে। 

জাতীয় গ্রিড থেকে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ যাচ্ছে- এ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য।

সন্দ্বীপ অনেক আগে পরিবর্তন হয়ে যেত। সমস্যা হলো সন্দ্বীপ একটি দ্বীপ। ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছে। সন্দ্বীপের শহর এখনকার জেলা শহরের চেয়ে ভালো ছিল। টাউন হল ছিল, লাইব্রেরী ছিল, কোর্ট-কাচারী ছিল...That was a different town. 

সন্দ্বীপের মানুষ কখনও গরীব ছিল না। বিদেশ থেকে অনেক টাকা পয়সা আসে। শুধু পড়াশোনা করা দরকার। সবকিছুর জন্য এডুকেশন জরুরী। এডুকেশন ছাড়া সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন করা যায় না।  তাছাড়া সন্দ্বীপের মানুষ অনেক সাহসী। যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জীবন যাপন করছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্দ্বীপের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিছু বলুন

সন্দ্বীপের শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এসে বলে- স্যার আমার বাড়ী সন্দ্বীপ। তারা সবসময় আমার কাছে প্রিভিলেজড্ পারসন (privileged person)। ভীড়ের মধ্যে তাদের দেখলে ডাক দেই। এই কান্ট্রি ম্যান্ এদিকে আস। তোমাদের কী সমস্যা বল। অন্যান্য কলিগরা তখন হাসে। এই দেখ স্যারের দেশি আসছে।

আমি তখন তাদের বলি আমার দেশিরা তোমাদের দেশিদের মতো নয় , ওরা হলো রেয়ার বার্ড ...সহজে পাওয়া যায়না। একটা দুইটা পাওয়া যায় সেজন্য বিশেষ খাতির। বাবা সন্দ্বীপের প্রচুর মানুষকে চাকুরী দিয়েছেন আমিও চেষ্টা করি কিছু করতে। 

রাজধানীর সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আপনার চিন্তা।  

এখনকার ঢাকা শহর তখনকার ঢাকা শহরের কোন মিল নাই। পুরো শহরে মাঠ ছিল। ঢাকা শহর পরিবর্তন হয়েছে মূলতঃ ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ এর মধ্যে। এ শহর মূলতঃ রিক্সার শহর। এখন কোন খেলার মাঠ নাই।

১৯৯০ সালের আগে ঢাকা ছিল Mid level town। সাংবাদিক সেলিনা হোসেন রোডটি ছিল আউটার সার্কুলার রোড, প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা যেটি এখন তোপখানা রোড ওটা ছিল ইনার সার্কুলার রোড। আউটার সার্কুলার রোড ছিল ঢাকা শহরের শেষ প্রান্ত। কিছু জায়গায় কয়েকটি বিল্ডিং ছিল বাকি সব ছিল টিনের বাড়ি। চতুর্দিকে ছিল খাল-বিল। 

ঢাকায় সুযোগ-সুবিধা বেশি। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেশি। ইনকামের সুযোগ বেশি। কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। সিটিলাইফে সুযোগ বেশি তাই মানুষ ঢাকামুখি। মূলতঃ ১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকা শহরের পরিবর্তন ঘটে। 

তখন যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ‘সিটিসেল’। তারা এক লাখ টাকার বেশি দামে ফোন বিক্রি করেছে। বিভিন্ন অপারেটর মার্কেটে আসার পর দাম দ্রুত কমে যায়। That was the beginning of the transformation of this country, in fact. 

১৯৯০ সাল থেকে মানুষ ঢাকা আসতে শুরু করে। তখন থেকে মানুষের সমৃদ্ধি ((affluence) ) আসা শুরু হয়। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি পিকআপ করে। মানুষের ইনকাম লেভেল অনেক  বেশি হয়ে গেছে।

একটা সোসাইটি কিন্তু পরিবর্তন আসে এন্ট্রিপ্রিনারশিপ যখন ডেভেলপ করে ঐ সোসাইটিতে। এনট্রিপ্রিনারশিপ আমাদের জন্য একটা বড় আশির্বাদ হয়ে আসল। আমরা আর চাকুরিজীবী জাতি হিসাবে তখন থাকলাম না। তখন মানুষের ইনকাম লেভেল অনেক বেড়ে গেল।  

১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০/১৫টি প্রাইভেট গাড়ি ছিল। আর এখন এতো খালি জায়গা থাকা সত্তেও গাড়ি রাখার জায়গা খুজে পাওয়া যায়না। যখন এফ্লুয়েন্স আসে তখন মানুষের যেসব চাহিদা আছে তথাকথিক গুড লাইফের জন্য সেগুলোর দিকে মানুষ ধাবিত হয়। কিন্তু যেসব সুযোগ সুবিধা থাকার দরকার যেগুলো আসলে রাষ্ট্র কিংবা কমিউনিটি প্রোভাইড করে সেগুলো তখন রাষ্ট্রের প্ল্যানিং এ থাকে না।

যখন দেশটা স্বাধীন হয় তখন ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৫ লাখ। ছোটবেলা থেকে ঢাকা দেখে আসছি। মৌচাক মার্কেটের উল্টোদিকে যে রাস্তা রামপুরার দিকে গেছে ঐ মোড়ে একটা কলেজ ছিল- আবু জর গিফারি কলেজ। এখন যেটা আরো ভিতরে। এ বাসায় আমরা ছিলাম।

বাসার পেছনে বিশাল পুকুর ছিল যেটাতে আমি নিজেই গোসল করেছি। সেখানে এখন বিরাট রাস্তা। সোনারগাঁর উল্টোদিকে বড় বড় বিল ছিল। আর ওই বিলের উপর বাঁশের মাঁচায় কাবাবের দোকান ছিল। অন্যদিকে সুন্দরবন হোটেলের সামনে ছিল ট্রেন লাইন। ঢাকা ট্রেন স্টেশনের নামছিল ফুলবাড়িয়া। পরে কমলাপুর হয়। তখন ছিল ঘোড়ার গাড়ি।

Growth আসার পর এসব infrastructure not in place তখনই প্রোবল্যাম ক্রিয়েট হয়। এ ধরনের দেশগুলোতে  compliance system  দুর্বল থাকে। মানুষ আইন ভাঙ্গে। আইন ভাঙ্গার পর অব্যবস্থার সৃষ্টি হলে এধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

যে সব দেশে অর্থনীতির উন্নয়ন আসছে সব দেশ এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের দেশের লোক অস্থির চিত্তের।

তবে বলে রাখলাম, এ চিত্র থাকবেনা। এই ঢাকা শহরে সব হবে। টঙ্গি ব্রিজ থেকে সদরঘাট এবং রায়েরবাজার থেকে মান্ডা-মুগ্ধা পর্যন্ত এই পুরো অঞ্চল থাকবে ডাউনটাউন। কোনদিন মানুষ গাড়িতে চলতে পারবেনা। মানুষকে চলার জন্য দ্রুত কিন্তু শস্তা জিনিস বানাতে হবে। হয় স্কাই ট্রেন না হয় আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন। না হয় অন্য কিছু একটা বানাতে হবে। সময়মতো সবকিছুর পরিবর্তন হবে। এবং তা হবে আগামী ২০ বছরে। অল্প সময়ে সম্ভব নয়। অবকাঠামো নির্মাণে সময়ের দরকার। 

আমাদের পরিকল্পনায় অনেক ভুল আছে। এদিকে টঙ্গি-সদরঘাট, এদিকে রায়েরবাজার- মান্ডা, মুগ্ধা। এটাকে যদি মূল ঢাকা শহর ধরা হয়, এর আশেপাশে থাকবে peripheral শহর। ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোতে মানুষ বসবাস করবে।

এমনকি কলকাতায়ও দুটো লাইন আছে। একটা হলো Budwan (bardhaman) লাইন আর অন্যটি হলো Bongaon লাইন। প্রতিদিন বিশ-ত্রিশ লাখ মানুষ আসে যাই। কাজ শেষে আবার ট্রেন এ করে চলে যাই। 

আমাদের এখানেও লোকজন আসবে আবার চলে যাবে। মানুষ ট্রেনে করে আসবে আবার বেরিয়ে যাবে। ঢাকার আশেপাশে কালিগঞ্জ, রায়পুরা, নরসিংদি, গাজিপুর আছে; এগুলোকে ট্রেন দিয়ে কানেক্টেড করে ফেলা উচিত ছিল। ট্রেন আসবে যাবে। তাহলে এখানে মানুষ কেন থাকবে।

তখন মানুষ মির্জাপুরে গিয়ে থাকবে কম ভাড়ায়। নিউ ইয়র্কে জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। আর ঢাকায়? যেটি আয়তনে নিউইয়র্কের অনেক ছোট। লোকসংখ্যা প্রায় ২ কোটি । সুতরাং এই শহরকে চালানো অনেক টাপ। এই শহরের মেয়রকে নিউইয়র্কের মেয়রের ‘বাপ’ বলা যেতে পারে। তাছাড়া নিয়ম-নীতির কেউ তোয়াক্কা করেনা। এগুলো নিয়ে কেউ ভাবেনা।

আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা আশেপাশের দেশগুলোর দিকে তাকায় না। আমরা যদি কলকাতার দিকে তাকাই তাহলে আমার দেশের মানুষ কেন কুড়িল বস্তিতে থাকবে। তবে এগুলো একদিন সমাধান হয়ে যাবে। 

আগামী ২০ বছর পর বাংলাদেশ হবে আরেক সিংগাপুর। পুরো দেশটা আর্বানাইজড হযে যাবে। 

১৯৯০ সালের পর থেকেই মূলত পরিবর্তন। মেসিভ চেঞ্জ বলা যায়। ১৯৯০ সাল হলো আমাদের টানির্ং পয়েন্ট। দেশস্বাধীন হওয়ার পর বেশ অসুবিধাজনক অবস্থা গেছে ২-৩বছর। সেটার একটা সুস্পষ্ট কারন (Obvisous Reason )  ছিল।  এক মিলিয়ন ডলার এর কম ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ছিল। সেখান থেকে দেশকে বাঁচানো ছিল সত্যিই কঠিন। খুব কষ্টকর জীবন ছিল। কিন্তু মানুষ সেটা বুঝে না। মানুষ সরকারকে গালি দেয় Which is not right. 

আগে মানুষ চাকুরী ছাড়া কিছু চিন্তা করত না। নতুন একটা পরিবর্তন (Transformation)  ঘটল ’৯০-এর পর। ঢাকা শহরে গাড়ি চড়া লোক খুব কম ছিল। আর এখন?

প্রাচুর্যের প্রাইজ দিতে হবে না? এখন সবাই গাড়িতে চড়তেছে কিন্তু রাস্তা কই। বনানিতে সব একতলা বাড়ী ছিল এখন সব বহুতলা ভবন। সবার গাড়ি কেনার সামর্থ আছে কিন্তু পার্কিং নাই বলে সবাই গাড়ি কিনে না। মিনিমাম দুইটা করে গাড়ি আছে বেশিরভাগ লোকের। এতো গাড়ি চলার জায়গা কই? সমাজে এতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে গেছে ঐ অনুয়ায়ী মার্কেট প্লেস নাই বলে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে। তবে এ অবস্থা ২০ বছর পর থাকবেনা। 

ঢাকা শহরের পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। জয়দেবপুর পর্যন্ত চলে যাবে। চলাফেরায় অনেক ফার্স্ট হবে। ফার্স্ট মুড অব ট্রান্সফোর্ট হবে। হতে পারে আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন, হতে পারে স্কাই ট্রেন অথবা সারফেস ট্রেন। গাড়িতে নয় মানুষ ব্যবসায়িক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করবে এই ট্রেনের মাধ্যমে।

পান্থপথ থেকে ধানমন্ডি ৩২ পর্যন্ত খাল ছিল সেটা এরশাদের আমলে বন্ধ করে দিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করলে অবশ্যই প্রকৃতি শোধ নিবে। এসবের কারনে ঢাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তাহলে পানি যাবে কোথায় ? তাছাড়া আমাদের ব্যবহারে অনেক সমস্যা আছে। যত্রতত্র ডাবের খোসা, পলিথিন ফেলছি। এগুলোর কারনে নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বক্স কালভার্ট গুলো ঠিকমতো কাজ করে না। এমনও হতে পারে এগুলো আবার ভেঙ্গে ফেলা হতে পারে প্রয়োজনের তাগিদে।

ঢাকা শহরের অনেকগুলো খাল ভরাট করে ফেলা হয়েছে। মানুষের যখন অনেক টাকা পয়সা হয়ে যাবে তখন আরো বেটার লিভিং এর জন্য নিজেদের প্রয়োজনের বিল্ডিং ভেঙ্গে জায়গা খালি করে দিবে। রাষ্ট্র প্রয়োজনে রিলোকেট করে দিবে মানুষদের। নিজেদের প্রয়োজনের আবার খালগুলো খনন করতে বাধ্য হবে সরকার। 

গুলশান ১ থেকে বাড্ডা পর্যন্ত একটি কানেকটিং রোড আছে। ওটা আগে খাল ছিল। ওখানে হাতিরঝিলের মতো একটা ব্রিজ করতে হবে। মগবাজারের মাথা থেকে লঞ্চে চড়ে গুলশান-বনানী গোরস্তান এর কাছে মানুষ নামবে।  অর্থাৎ এই পথটুকু কানেক্ট হবে। এই পরিবর্তন ২/৩ বছর পর হবে।

বাংলাদেশ নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নাই। ঢাকা শহরের শেষ কমার্শিয়াল এলাকা ছিল বায়তুল মোকাররম মার্কেট, হাউজবিল্ডিং এর শেষ মাথা, তারপর গুলিস্তান। ওটা ছিল ঢাকা শহরের নতুন কমার্শিয়াল এলাকা। ২ টা দোকান ছিল বাঙ্গালীর। চশমার দোকান আর ঔষধের দোকান। আর বাঙ্গালীর যত দোকান ছিল সব ছিল মুদি দোকান। এই ছিল বাঙ্গালীর ব্যবসা। আর কিছু লোক চোট-খাটো কন্ট্রাক্ট্ররি করত।

ব্যবসায়ী ছিল মূলত জহুরুল ইসলাম আর চট্টগ্রামের একে খান। এরা ছিল বড়লোকের পর্যায়। এখন সাধারন মানুষের যে টাকা আছে সেই টাকাওয়ালা মানুষদের তখন বড়লোক বলা হতো। আর এখন দামি দামি গাড়ি চালাই লাখ লাখ লোক। আমরা তাদের বড়লোক বলি না। এখন বড়লোক হতে হলে ৫০০/১০০০ কোটি টাকা থাকতে হবে। It’s a great change and transformation.

শেয়ার করুন:-