সন্দ্বীপের আলো: এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী

ফিচার ডেস্ক  

৪৪৪

প্রকাশিত: ১১:৫৩, ২৫ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১২:৪৫, ৩০ জুলাই ২০২০

শেয়ার করুন:-
এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী

এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী

দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ। রত্নগর্ভা হিসেবেই যার বহুল পরিচিতি। এর আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন অনেক কীর্তিমান। যাঁদের অনেকেই এখন দেশে-বিদেশে আলো ছড়াচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এঁদের অনেকেই নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। আবার অনেকেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন আলোটুকু। 

সেই আলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ‘ইকরা নিউজ২৪.কম’ আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর। ইকরা নিউজ চায়, স্বরণের মনিকোঠায় আপনিও অম্লান থাকুন।

( ক্লিক করে পেজটিতে লাইক দিন। ভালোর সঙ্গে থাকুন। অন্যকেও ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করুন।)

সন্দ্বীপের আলো (৪)

সন্দ্বীপের স্বাধীন রাজা দেলোয়ার খাঁ ওরফে দিলাল রাজার ছিলেন এক ছেলে আর দুই মেয়ে। বড় মেয়ের নাম মুছা বিবি আর ছোট মেয়ের নাম মরিয়ম বিবি। মুছা বিবির বিয়ে হয়েছিল পরগনা সন্দ্বীপের ইজারাদার চাঁদ খার সঙ্গে। তাদের চার ছেলে । জুনুদ খাঁ, মুকিম খাঁ, সোরুল্লা্ খাঁ আর নোরুল্ল্যা খাঁ। তৃতীয় ছেলের সপ্তম অধঃস্থন পুরুষ হলেন বর্তমান সন্দ্বীপের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী।

ছিদ্দীক চৌধুরী ছিলেন একজন সফল সরকারি কর্মকর্তা। ছাত্রজীবনে করেছেন পাকিস্তান আন্দোলন আর ভাষা আন্দোলন। একাত্তরে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সমর্থক। এখনো নিজেকে জড়িত রেখেছেন নানা রকম সমাজকল্যাণমূলক কাজে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর বড় পরিচয় হলো তিনি একজন ইতিহাসবিদও। 

(কখনো ভেবে দেখেছেন- কে আমি? আমার কি করা উচিত আর কি করছি? প্রতিদিন একবার ভাবুন-জীবন বদলে যাবে। পড়ুন: বদলে যান )

সন্দ্বীপের ইতিহাসের একজন নিমগ্ন গবেষক। অতীত খুঁড়ে তুলে আনছেন নিজের জন্মভূমির গৌরবময় ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ ইতিহাস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে রেখে যাচ্ছেন তাদের শিকড়ের ঠিকানা। এভাবে নিজেকে তুলে এনেছেন সমকালীন সন্দ্বীপের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনন্য তালিকায়। 

এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরীর জন্ম ১২ নভেম্বর, ১৯৩৫ সাল। বাবার নাম মোহাম্মদ ইছমাইল চৌধুরী, মা চেমন আফরোজ চৌধুরী। মোহাম্মদ ইছমাইল চৌধুরী ছিলেন ভিলেজ হেডম্যান। এক সময় তিনি বরিশালে শাহাবাজপুরে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের এস্টেটে চাকরি করতেন। 

ঐতিহ্য সচেতন পুরনো ভাবধারার এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ও নিয়মিত নামাজী। তার সময়ে গ্রামে খতমে তারাবির সুযোগ ছিল না। কিন্তু মোহাম্মদ ইছমাইল চৌধুরী গ্রাম থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত ফুলবিবি সাহেবানীর মসজিদে খতমে তারাবি পড়ার জন্য প্রতিদিনই চলে যেতেন।

বাল্যশিক্ষা শুরু হয়েছিল নিজের গ্রাম বাউরিয়ার বোর্ড স্কুলে। তৃতীয় শ্রেণী পাস করেন হরিশপুর বোর্ড স্কুল থেকে। আরবি শিক্ষা চাচা আব্দুল বাচেত চৌধুরীর কাছে। ১৯৪৩ সালে বড় ভগ্নীপতি মোহাম্মদ আমিন উল্ল্যা মিয়ার সাথে তার কর্মস্থল হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমায় চলে যান। মোহাম্মদ আমিন উল্ল্যা মিয়া ছিলেন ওই মহকুমার ডি আই ও। মোহাম্মদ ছিদ্দীক চৌধুরী আরামবাগ হাই স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণী পাস করেন। 

১৯৪৫ সালে তিনি ফের সন্দ্বীপ এসে সন্দ্বীপ হাই স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে সন্দ্বীপ হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন তিনি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী ছিলেন রাজনীতি সচেতন।সন্দ্বীপ টাউনে থাকাকালে থানা মুসলিম লীগের উদ্যোগে পাকিস্তান অর্জনের জন্য মিছিল-মিটিং হতো, তিনি তার প্রত্যেকটাতেই অংশ নিতেন। গলার রগ ফুলিয়ে স্লোগান দিতেন: পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান পায়েন্দাবাদ, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান…এসব।

মেট্রিক পাস করার পর ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন ছিদ্দীক চৌধুরী। ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করেন তিনি। ওই সময় জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি এফ আর খানের বাবা খান বাহাদুর আবদুর রহমান। 

(পড়ুনঃ  সাফল্যের পথে প্রতিদিন কোরআনের ৫ আয়াত )

জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালে অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক বিসি রায়, শৈলেন ভদ্র, অধ্যাপক অজিত গুহ, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মোস্তফা নূর উল ইসলাম, অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসে (প্রাক্তন বিচারপতি ও মন্ত্রী), অধ্যাপক বোরহান উদ্দীন।

জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় রাষ্ট্রভাষা আনোদলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী। বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। ভাষা আন্দোলনে জগন্নাথ কলেজের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সময় এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় উপস্থিত ছিলেন। ১৪৪ ধারা অমান্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটের ভেতর থেকে রাস্তায় নেমেছেন, এমন সময় মেডিক্যাল কলেজের ভেতর ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। 

এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাওয়াদুল করিম (পরে শেখ হাসিনার প্রেস সচিব) ও ওয়াজেদ হোসেন (পেশাগত জীবনে অগ্রণী ব্যাংকের বড় অফিসার)। এরা এক সঙ্গে থাকতেন, এক সঙ্গে চলাফের করতেন। ভাষা আন্দোলনের মিটিং-মিছিলেও তারা এক সঙ্গে থাকতেন। আজিমপুর কলোনীতে ভগ্নিপতির বাসায় থেকে লেখাপড়া করতে এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী। 

কলোনির পশ্চিম পাশে ছিল ‘আমাদের প্রেস’ নামে একটি ছাপাখানা। ছাপাখানাটির মালিক ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত অধ্যক্ষ আবুল কাশেম। এ প্রেস থেকেই বের হতো তৎকালীন ‘সৈনিক’ পত্রিকা। ভাষা আন্দোলনের নিরপেক্ষও বস্তুনিষ্ঠ খবর পরিবশেন করত এই পত্রিকা। ওই প্রেসেই তমুদ্দুন মজলিশের সভা বসত। ছিদ্দীক চৌধুরী ওসব সভায় যোগদান করতনে। 

১৯৫৪ সালে ঢাকা কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন তিনি। ১৯৫৭ সালে বিএ পাস করেন। বিএ পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগে ও পরে সন্দ্বীপের সেনেরহাট জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৫৪ সালে বিএ ভর্তি হওয়ার আগে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের মুসলিম লীগ প্রার্থী সৈয়দ আবদুল মজিদের পক্ষে প্রচারে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সন্দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত ছোট-বড় প্রায় ৩০টি জনসভায় বক্তৃতা করেন। সৈয়দ আব্দুল মজিদের পক্ষে তিনিই ছিলেন একমাত্র ছাত্র বক্তা, যার বক্তৃতা শোনার জন্য মিটিংয়ে মানুষের ঢল নামত। 

বিএ পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ল’ পাস করেন তিনি। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস বিভাগে অডিটর পদে চাকরি গ্রহণ করেন। চাকরিরত অবস্থায় এসএএস ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা পাস করেন। ১৯৯২ সালে প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। 

১৯৬৬ সালে গাছুয়ার ওয়াহিদুল মাওলা চৌধুরীর মেয়ে সবিতা খুরশিদ চৌধুরীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন এবিএম ছ্দ্দিীক চৌধুরী। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সিফাত শারমীন চৌধুরী (বিএ, অনার্স, এমএসএস) একটি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। ছেলে ইমরু-আল-কায়েস চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত। ছোট মেয়ে ইফফাত শারমীন চৌধুরী বর্তমানে আমেরিকায় পিএইচডি গবেষণারত।

সন্দ্বীপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা কর্মকাণ্ডে নিবেদিতপ্রাণ এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী। জড়িত ছিলেন সন্দ্বীপ এসোসিয়েসনসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। সন্দ্বীপকে চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্তকরণের আন্দোলনের একজন কর্মী ছিলেন তিনিও। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন ঐতিহাসিক হিসেবে। 

‘শাশ্বত সন্দ্বীপ’ নামে তাঁর লেখা গ্রন্থটি সন্দ্বীপের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর লেখা নির্ভরযোগ্য একটি গ্রন্থ। বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৫-৬৬ সালের মধ্যে। কিন্তু প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে । ১৯৯৮ সালে প্রকাশত হয় মুক্তিযুদ্ধে সন্দ্বীপ। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ হলো সন্দ্বীপের বৈচিত্র্যময় লোক সাহিত্য (২০০৪), সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান: যারা আজ নেই (২০০৮) ও অতীতের এক টুকরো (২০০৯)। একজন বাঙালি মুসলমান বীর (২০১১) একেএম রফিক উল্যা চৌধুরী। 

সম্পাদিত গ্রন্থ

৭০ বর্ষে সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল (২০০৪), ৭৫ বর্ষে সন্দ্বীপ মডেল হাই স্কুল (২০০৮), উচ্ছ্বাস(২০০৯), মুহম্মদ আমিন উল্ল্যাহ্ স্মারকগ্রন্থ (২০১০)।

এছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় সন্দ্বীপ শিক্ষা ও সংস্কৃতি পরিষদের মুখপত্র ‘রূপসী সন্দ্বীপ’ এর ১৯৭৮, ’৭৯ ও ’৮০ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রকাশনা কমিটির সদস্য ছিলেন ১৯৯৯ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘সন্দ্বীপ সমীক্ষা’ ম্যাগাজিনেরও। 

নিজের লেখালেখি সম্পর্কে এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনের আনন্দে লিখি। বাঁচার জন্যে লিখি। নিজে যা জানি, তা অন্যদের জানানোর ইচ্ছে থেকেই লিখি।’(তথ্যসূত্র: সন্দ্বীপে শত ব্যক্তিত্ব)

দৃষ্টি আকর্ষণ:

কারো সংগ্রহে যদি মি. এবিএম ছিদ্দীক চৌধুরীর ভালো ছবি থাকে আমাদের দিয়ে সহযোগিতা করুন। সংগৃহীত তথ্যে ঘাটতি থাকলে নিচে দেয়া মেইলে বিস্তারিত লিখে জানান। 

সন্দ্বীপের বিশেষ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আপনিও লিখতে পারেন। যাঁকে নিয়ে লিখবেন তাঁর ভালো কিছু ছবি দিবেন; সাথে লেখকের ছবি, ঠিকানাসহ দিবেন। লেখা এবং ছবি পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]  

(ভালোর সাথে থাকুন, ইকরা নিউজ পড়ুন)   

শেয়ার করুন:-