সন্দ্বীপের আলো: সালেহা বেগম

ফিচার ডেস্ক  

৮৪৮

প্রকাশিত: ১২:৩৫, ৩০ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২০:০৬, ৩০ জুলাই ২০২০

শেয়ার করুন:-
১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ। রত্নগর্ভা হিসেবেই যার বহুল পরিচিতি। এর আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন অনেক কীর্তিমান। যাঁদের অনেকেই এখন দেশে-বিদেশে আলো ছড়াচ্ছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এঁদের অনেকেই নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত। আবার অনেকেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন আলোটুকু। 

সেই আলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ‘ইকরা নিউজ ২৪.কম’ আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর। ইকরা নিউজ চায়, স্বরণের মনিকোঠায় আপনিও অম্লান থাকুন।

( ক্লিক করে পেজটিতে লাইক দিন। ভালোর সঙ্গে থাকুন। অন্যকেও ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করুন।)

সন্দ্বীপের আলো (৫)

সালেহা বেগম ১৯৫৩ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর সন্দ্বীপের মুছাপুর গ্রামের ওসমান গনি তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওসমান গণি তালুকদারের ছেলে সোলায়মান বাদশা তালুকদারের মেয়ে। 

ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর মাতার নাম ছিল মমতাজ বেগম। 

১৯৫৯ সালে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৯৬৯ সালে দাদার নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত বদিউজ্জামান হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সরকারী গার্লস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। 

তিনি বদিউজ্জামান হাই স্কুল থেকে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পাশ করা প্রথম ছাত্রী এবং ১৯৬৬ সালে ৮ম শ্রেণির স্কলারশীপ পরীক্ষায় উক্ত স্কুল থেকে বৃত্তি প্রাপ্ত একমাত্র ও প্রতিষ্ঠার পর বৃত্তি পাওয়া প্রথম ছাত্রী। 

১৯৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। লেখাপড়ার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার ও সার্টিফিকেট অর্জন করেন।

(কখনো ভেবে দেখেছেন- কে আমি? আমার কি করা উচিত আর কি করছি? প্রতিদিন একবার ভাবুন-জীবন বদলে যাবে। পড়ুন: বদলে যান )

সালেহা বেগম পেশাগত জীবনে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তিনি ১৯৭৯ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের সুতিকাগার জোবরায় ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সাথে একজন গবেষণা সহকারী ও একই সঙ্গে একজন মাঠকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। 

গ্রামীণ ব্যাংকের চাকুরীকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে গ্রাম পর্যায়ে গরীব অসহায়, দুস্থ ও সম্বলহীন নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে ১৭ বছর কাজ করেছেন। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রতিকুলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবুও তিনি তাঁর ওপর অর্পিত কাজ থেকে পিছ পা হননি। 

তাছাড়া তিনি ইউনিসেফের আর্থিক সহায়তায় গ্রামীণ ব্যাংকের মহিলা সদস্য ও শিশু উন্নয়নের ওপর দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এর নির্বাহী পদে দীর্ঘদিন কাজ করেন। 

তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের একমাত্র মহিলা আঞ্চলিক ম্যানেজার যিনি অন্য দশটি যোনে একই পদে থাকা পুরুষ সহকর্মীদের সাথে পাল্লা দিয়ে দক্ষতার সাথে কাজ করেছেন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রথম যোনাল অডিট অফিসার হিসেবে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ৪টি জেলার ৮২টি শাখার অডিটের দায়িত্ব পালন করেন। 

সালেহা বেগম গ্রামীন ব্যাংকের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক স্তর যোনাল ম্যানেজার হিসেবে বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী যোনের ৬টি জেলার ৮০টি শাখা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন। ফিল্ড পর্যায়ে কাজের সময় তিনি ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা এবং ১৯৯৮ সালে দীর্ঘ দিনের প্রলম্বিত বন্যা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেন।

(পড়ুনঃ  সাফল্যের পথে প্রতিদিন কোরআনের ৫ আয়াত )

তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে ভিয়েতনাম, কলকাতা, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স এবং জার্মানী উল্লেখযোগ্য।১৯৮৭ সালে তিনি জার্মান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত Promotion on self help by savings Bank এর ওপর ডায়লগ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তিনি পশ্চিম জার্মানীর সেন বেলিন, বাক ফরেস্ট ও রাজধানী বনসহ বিভিন্ন শহর সফর করেন। 

১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ঋণের ওপর পশ্চিম বঙ্গের কৃষি ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার সাথে ডায়লগ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামের Women’s Union এর আমন্ত্রণে গ্রামীণ ব্যাংক রেফ্রিকেসনের জন্য ভিয়েতনাম গমন করেন। এ সময় তিনি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়সহ বিভিন্ন শহর ভ্রমণ করেন। 

১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি জার্মানীর Wlimar এ German Commision for justice & peace কর্তৃক আয়োজিত Social Development শীর্ষক Workshop এ অংশগ্রহণ করেন। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ভারতের দিল্লিতে ৫ দিনের একটি কলোডিয়ামে অংশগ্রহণ করেন। ২০০২ সালের জানুয়ারী ২০ থেকে ২৫ পর্যন্ত তিনি ব্যাংককে Syngenta Stakeholder Dialogue  এ Sustainable Agriculture এর ওপর সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। 

সালেহা বেগম ২০০১ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের পরামর্শক্রমে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অবসর নিয়ে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গ্রামীন ব্যবসা বিকাশে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। শুরু থেকে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান যেমন- গ্রামীণ ড্যানোন ফুডস লি., গ্রামীণ ট্রাস্ট, গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লি. এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে তিনি নিয়োজতি ছিলেন। 

কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত না হয়ে তিনি বেশ কিছু সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত আছেন। তার মধ্যে অন্যতম সন্দ্বীপ ডেভেলপমেন্ট ফোরম লি. ঢাকা ও সন্দ্বীপ কবরস্থান ফাউন্ডেশন ইত্যাদি।

সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতেও রয়ে তাঁর অবাধ বিচরণ। সন্দ্বীপ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম লি. ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দ্বীপের চিঠি’র সহসম্পাদক হিসেবে জড়িত আছেন। গ্রীন নামক একটি সমাজ উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও বর্তমানে উপদেষ্টা তিনি।

মিসেসে সালেহা বেগম নিয়মিত গ্রামীণ ব্যাংকের ঘরোয়া পত্রিকা গ্রামীণ উদ্যোগে লেখালেখি করেন। ১৯৯৮ সালে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার সময় ‘বন্যাদুর্গত গ্রামীণ মহিলাদের জীবন চিত্র’ এর ওপর একটি গবেষণাধর্মী লেখার জন্য ড. মোহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ লেখকের পুরস্কার পান। এছাড়া তিনি আরো তিনটি বই লিখেন। 

জীবনে সততা, দেশপ্রেম, সমাজসেবা ও কর্মস্থলে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। সমাজ, দেশ ও নিজের পেশাগত জন্য যা ভাল মনে করেছেন, তা-ই করার চেষ্টা করেছেন সবসময়। 

সালেহা বেগম কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম থানার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৭৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্বামী সাহাব্ উদ্দিন সাথীও একজন সমাজকর্মী। তিনি একটি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা গ্রীন-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সালেহা বেগম সংসার জীবনে একমাত্র কন্যা সন্তানের জননী। তাঁর মেয়ে ফারাহ্ হুরাইন একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। বর্তমানে তিনি মিরপুর ডিওএইচএস-এ তাঁর নিজস্ব বাসভবনে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন।  (তথ্যসূত্র: সন্দ্বীপে শত ব্যক্তিত্ব)

দৃষ্টি আকর্ষণ:

কারো সংগ্রহে যদি মিসেস সালেহা বেগমের ছবি থাকে আমাদের দিয়ে সহযোগিতা করুন। সংগৃহীত তথ্যে ঘাটতি থাকলে নিচে দেয়া মেইলে বিস্তারিত লিখে জানান। 

সন্দ্বীপের বিশেষ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আপনিও লিখতে পারেন। যাঁকে নিয়ে লিখবেন তাঁর ভালো কিছু ছবি দিবেন; সাথে লেখকের ছবি, ঠিকানাসহ দিবেন। লেখা এবং ছবি পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]   

(ভালোর সাথে থাকুন, ইকরা নিউজ পড়ুন)   

শেয়ার করুন:-