সাফল্য-ব্যার্থতা আর সৃষ্টিতে উৎস হয়েই আছেন রাজিব স্যার

কানাই চক্রবর্তী

৩৬২

প্রকাশিত: ১০:৫৭, ৮ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১১:২২, ৮ জুলাই ২০২০

শেয়ার করুন:-
 অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ূন  ১৯৫১-২০১৭  (ইনসেটে: লেখক)

 অধ্যাপক ড. রাজীব হুমায়ূন  ১৯৫১-২০১৭  (ইনসেটে: লেখক)

এক.

আশির দশকের একদিন। স্যারকে আমি প্রথম আবিষ্কার করি সন্দ্বীপে আমার বাড়িতে, প্রায় দুপুর বেলায়। আমার এখনো মনে আছে প্রথম দেখাতেই আমি স্যারকে দেখে অভিভূত হয়ে যাই।

কালো প্যান্ট, সাদা ডিজাইন করা শার্ট তার দুধে আলতা রং-এর শরীরে মিলেমিশে এমন একটি ব্যক্তিত্ব  তৈরি করেছে, যা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আমি তখনো জানিনা উনি কে ? বাবার সঙ্গে বসে আলাপ করছেন। সম্ভবত সন্দ্বীপের শিল্প সাহিত্য নিয়ে।

ভেতরে মা জানালেন, উনার নাম রাজিব হুমায়ুন। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। বাংলা পড়ান। সন্দ্বীপের দক্ষিণ সন্দ্বীপে উনার বাড়ি।  জানলাম দুপুরে উনি বাসায় খাবেন এবং স্টিমার আসলে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা চলে যাবেন। আমি এই প্রথম আমার বাসায় একজন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের  শিক্ষককে দেখলাম। এমনিতেই আমার বাবা শিক্ষক এবং শিল্প সংস্কৃতির লোক হওয়াতে আমাদের বাসা এবং বইয়ের দোকানে স্কুল-কলেজ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সবসময় থাকতো ।

যাহোক, স্যারের সঙ্গে সেদিন আমার টুকটাক কথা হয়। আমি নাটক করি এবং আমাদের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন (বিচিত্রা ফোরাম ক্লাব) আছে শুনে স্যার খুব খুশি হন এবং উৎসাহিত করেন। এর মধ্যেই স্টিমারের সিটি শোনা যায়।  আমি একটি রিকশা ডেকে দিয়ে স্যার কে উঠিয়ে দেই এবং তিনি স্টিমারঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এর আগে তিনি আমাকে  উনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা বলেন। এরপর থেকে স্যার যখনই সন্দ্বীপ আসতেন এবং চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা যাওয়ার সময় হয় আমাদের বাসা অথবা বইঘরে যাত্রাবিরতি দিতেন। বইঘরে স্যার যখন বসতেন তখন দ্বীপের সংস্কৃতি এবং নাট্যকর্মীদের ভীড় লেগে থাকতো। 

( ক্লিক করে পেজটিতে লাইক দিন। ভালোর সঙ্গে থাকুন। অন্যকেও ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করুন।)

দুই.

সম্ভবত ’৮৪ সাল। স্যার  তখন সন্দ্বীপে। আমার লেখা ‘চুপ তিনি আসছেন’ নাটকের প্রথম প্রদর্শনী   সন্দ্বীপ কলাভবন মঞ্চে। রাজিব স্যার প্রধান অতিথি। স্যারের উপস্থিতির কারণে কলাভবন মঞ্চে তখন উপচে পড়া ভীড়। প্রায় সোয়া ঘন্টার নাটক তিনি উপভোগ করলেন নিবিষ্ট মনে। নাটক শেষে সেকি উচ্ছ্বাস। সন্দ্বীপে আধুনিক আঙ্গিকে নাটক হয় স্যার ভাবতেই পারেননি। নাটক শেষে তিনি  ছোট-খাট একটা বক্তব্যও রাখলেন। আসলে আমার এ নাটকটি ছিল রূপক ধর্মী এবং আঙ্গিক প্রধান। সংলাপ অন্তমিলের। শাসক এবং রাজনীতিবিদদের নিয়েই নাটক। কিন্তু পাত্র-পাত্রি রাজা, মন্ত্রী, রাজকবি। এরশাদের সামরিক শাসনের আমলে হলেও রাজা মহারাজাদের আবরণে মূলত এ শাসন নিয়েই  ব্যাঙ্গাত্বক নাটক ছিল এটি। স্যারের উচ্ছ্বাস এবং উৎসাহ  উদ্দীপনায় আমরাও উদ্দীপ্ত হই।

উনি আমাদেরকে অনেক উপদেশ দেন। পরে তিনি আমাকে পড়ার জন্য নাটক সম্পর্কিত কয়েকটি বই দেন। শর্ত বইগুলো যেহেতু জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের, আমাকে অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। বইগুলোর নাম এখন ভুলে গেছি। তবে  মনে হয় একটি ছিল অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা।  একটি  বিদেশী  নাটকের  অনুবাদ সংগ্রহও ছিল।

এ বইতেই  আমি আন্তন চেখব, ইউজিন নীল, সেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটকগুলোর বাংলা অনুবাদ পড়ার সুযোগ পাই। স্যারের দেয়া এসব বই থেকে প্রথম জানতে পারি  স্তাানিলা ভস্কি, ব্রেখট, থার্ড থিয়েটার, প্রসেনিয়াম থিয়েটার, ইলিয়শন জাতীয় নাটকের ট্রামগুলো যা  আমার পরবর্তী সময়ের নাট্যচর্চায় অনেক ঋদ্ধ করেছে। আর আমার  নাট্যচর্চা  নিয়ে স্যারের মূল্যায়ন  ছিল আমার জন্য অনেক কম বয়সে বিরাট প্রাপ্তি। সেই সময়ের আরো পরে স্যারের সম্পাদনায় ‘সন্দ্বীপের ইতিহাস’ গ্রন্থাকারে  প্রকাশ পায়।

এর আগে একটি মাত্র সন্দ্বীপের ইতিহাস ছিল, যেটা লিখেছিলেন অধ্যাপক রাজকুমার চক্রবর্তী। স্যারের  সম্পাদনায় সন্দ্বীপের ইতিহাসে নাট্যকার হিসেবে  আমার নাম দেখে যুগপৎ অবাক এবং উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম। অবাক হয়েছিলাম এ কারণে, আমার নাটক লেখা বা নাট্যচর্চার বয়স তিন বা চার বছর না হতেই রাজিব স্যারের লেখা সন্দ্বীপের ইতিহাসে স্থান করে নেয়া, স্যারের অতিরিক্ত স্নেহ থেকে উৎসরিত নয়তো। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে স্যারের কাছে অনুযোগ করতেই  তিনি জানালেন ‘আমি-ই সন্দ্বীপে নতুন ধারার নাটকের প্রবর্তক।

সুতরাং আমার নামতো ইতিহাসে আসবেই।’  নতুন ধারা-টারা আসলে কী সেসময় আমিও তা বুঝতাম না। নাটক ভালো লাগে তাই করছি। এ আরকি। তবে একটা বিষয় বুঝতে পারছি, আগে যেভাবে সারারাত ধরে নাটক হতো আমরা সেই ধারাটা তখন পাল্টিয়ে দিয়েছিলাম। মাত্র দেড় থেকে দুঘন্টার নাটক। কোন বাজারের পান্ডুলিপি নয়।  আমাদের নিজস্ব লেখায় গণমানুষের বিষয়কে উপজীব্য করে পরিবেশিত হতো এসব নাটক। পরবর্তী সময়ে  স্যার আমার  আরো দু-একটি নাটকে দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 

( কখনো ভেবে দেখেছেন- কে আমি? প্রতিদিন একবার ভাবুন- জীবন বদলে যাবে। পড়ুন: বদলে যান )

তিন.

স্যারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা একসময় যেন সখ্যতায় রূপ নেয়। বিশেষ করে সন্দ্বীপ থিয়েটার গঠনের পর ১৯৮৯ সালে যখন তিনদিনব্যাপী  একটি নাট্যউৎসবের আয়োজন করি। স্যার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষক । আর আমাদের থিয়েটার উৎসবটি শুরু হয়েছিল ঐ বছরের ২৯, ৩০ মার্চ ও ১ এপ্রিল। উৎসবে চট্টগ্রামের দুটি নাটকের দল (কালপুরুষ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার) এবং আয়োজক সন্দ্বীপ থিয়েটার ও দক্ষিণ সন্দ্বীপ থিয়েটার অংশগ্রহণ করে। চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. মো: ইদ্রিস আলী, মহিবুল আজিজ এবং বাংলা বিভাগেরই প্রাক্তন ছাত্র কবি এবং সাংবাদিক  বিশ্বজিৎ চৌধুরীও অতিথি হিসেবে উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।  রাজিব স্যার প্রধান অতিথি এবং দ্বীপবন্ধু হিসেবে খ্যাত মুস্তাফিজুর রহমান উৎসবের উদ্বোধন করার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে দু’জন উপস্থিত থাকতে পারেননি। 

উৎসবের আগে আমি এবং সন্দ্বীপ থিয়েটারের সচিব সিরাজ (সিরাজুল মাওলা, বর্তমানে মুস্তাফিজুর রহমান  কলেজের বাংলার শিক্ষক) ঢাকায় আসি রাজিব স্যারের পরামর্শ নেয়া, উপস্থিতি নিশ্চিত করাসহ  মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেয়ার জন্য। নাট্যউৎসবের কথা শুনে অভিভূত স্যার  তৎক্ষণাৎ মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাছে ফোন দিয়ে আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানান। তিনি আরো বলেন, উনার কাছে অনেকেই যে কারণে দেখা করতে যান আমরা তা না। টেলিফোনে  স্যারের ভাষা ছিল উনি সন্দ্বীপে দু’জন ক্রীমকে  পাঠাচ্ছেন। মুস্তাফিজুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবেই আমাদের  পাঠিয়ে দিতে বললেন।  স্যারের  আহ্বানে  তিনি যে এভাবে সাড়া দিবেন তা আমাদের কল্পনাতেও  ছিলনা ।

আমরা মতিঝিলে মুস্তাফিজুর রহমানের বিসিআই কর্মস্থলে হাজির হওয়ার পরেই তা যেন টের পাই। গেটে আমাদের পরিচয় দেয়ার সাথে সাথেই আমাদেরকে দ্বীপবন্ধুর কক্ষে পৌঁছে দেয়া হয়। মনে হয় যেন সবাই আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন। যাহোক মুস্তাফিজুর রহমানকে আমাদের আসার উদ্দেশ্য জানাতেই তিনি অবাক বিস্ময়ে  আমাদের মুখপানে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষন পরে  পাশে বসা একজনকে ( পরে  জেনেছি  মন্ত্রী )  খুবেই আবেগ তাড়িত  কন্ঠে  বলে উঠেন ‘ দেেেখন দেখেন  ওরা আমার সন্দ্বীপের ছেলে । সন্দ্বীপের মত জায়গায়  নাট্যউৎসব করছে ।  মন্ত্রীও খুব অবাক হলেন  সন্দ্বীপের সংস্কৃতির উর্বরতা দেখে । 

(পড়ুনঃ  সাফল্যের পথে প্রতিদিন কোরআনের ৫ আয়াত )

মুস্তাফিজুর রহমানের সেদিনের উচ্ছসিত  মুখ এখনো ভুলার নয় । প্রকৃতপক্ষে এ উচ্ছাস দিয়ে তিনি মন্ত্রীকে সন্দ্বীপের মর্যদাই তুলে ধরেছিলেন। মুস্তাফিজুর রহহমানও বুঝাতে চেয়েছিলেন  সন্দ্বীপ কোন অবস্থাতেই চরাঞ্চল নয় ।  শিক্ষা সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে ।  তিনি তাৎক্ষনিক ভাবে আমাদেরকে পাঠানোর জন্য রাজীব স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন দেন । আমাদের মিশন সফল হওয়ার পর  দুজনে স্যাার এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে বিদায় নিই ।  মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে এ সেতু বন্ধনের একমাত্র কৃতিত্ব রাজিব স্যারেরই । 

১৯৯১ সালে আমি পুরোপুরি ভাবে ঢাকায় চলে আসি । এর আগে   রাজিব স্যার এর পিড়াপিড়িতে ( ফিরোজ ভাইও ছিলেন)  মুস্তাফিজুর রহমানের  দৈনিক রুপালীতে  সাংবাদিক হিসাবে যোগ দিই । এর পর স্যারের সঙ্গে অনেক বার দেখা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে স্যার এর সঙ্গে ( তখন আমি দৈনিক যুগান্তরে ) আমার স্ইে সাক্ষাৎ টি  নানা কারণে আমার কাছে বিশিষ্ট হয়ে আছে  এবং থাকবে ।

সে সময় আমি অন্য এক রাজিব হুমায়ুন স্যারকে দেখেছিলাম। উনি আমার কাছে এসেছিলেন একটি পরামর্শ এবং সাহায্যের জন্য । তিনি এমন একজন ব্যাক্তির  বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন , যা মনে হলে আমি এখনো  চমকে উঠি । শুধু তাই নয়  মামলার পর যাতে মিডিয়ায়  কভারেজ হয় তার ব্যাবস্থা আমাকে  নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি  । আমি স্যারের দিকে অনেকক্ষন  তাকিয়েছিলাম । খুজতে ছিলাম অন্যকিছু। পরে উনার এক আত্নীয়ের কাছে জানতে পেরেছিলাম স্যারের শরীর ভালো নেই । মানসিক ভাবেও না । 

এইযে স্যার মানসিক ভাবে ভালো ছিলেন না- কেন ছিলেন না  তার খোজ খবর  কেউ আমরা নিতে পারিনি।  তার কাছে জানতে চাইনি তিনি কেন মানসিক ভাবে ভালো নেই। আমাদের এ গ্লানি আমাদের সমর্পিত করে অবশেষে জীবন থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি। জানিনা  আরো অনেকের মত স্যার এর মূল্যায়ন একদিন হবে কিনা । তবে স্যার আছেন আমার সকল সাফল্যে- ব্যার্থতায় আর আমার সৃষ্টিতে উৎস হয়েই । রাজিব স্যার আপনাকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।   

(অধ্যাপক ড. রাজিব হুমায়ূন স্যারের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে ‘‘ইকরা নিউজ” পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা...)

(ভালোর সাথে থাকুন, ইকরা নিউজ পড়ুন) 

শেয়ার করুন:-